শনিবার, ৯ মে ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩
ফাইল ছবি
মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট বা MSG বহু বছর ধরে খাবার ও পুষ্টি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। রাসায়নিকভাবে MSG হলো গ্লুটামিক অ্যাসিডের সোডিয়াম লবণ, যা একটি অ্যামিনো অ্যাসিড এবং টমেটো, মাশরুম, চিজ, সয়া সস এমনকি মায়ের দুধেও স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়।
বাণিজ্যিকভাবে MSG তৈরি করা হয় আখ বা বিটের মতো উদ্ভিদজাত উপাদান ফারমেন্ট করে একটি সাদা, গন্ধহীন গুঁড়ো আকারে। খাওয়ার পর MSG শরীরে সোডিয়াম আয়ন এবং ফ্রি গ্লুটামেটে ভেঙে যায়—যা আমরা প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার থেকেও নিয়মিত গ্রহণ করি।
গ্লুটামেট জিহ্বার “উমামি” (সুস্বাদু ঝাল-ঝাল নোনতা স্বাদ) রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয়ে খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। এই কারণেই অনেক খাবারে “মাংসের মতো” সুস্বাদু অনুভূতি পাওয়া যায়। তাই MSG কোনো অচেনা বা ক্ষতিকর রাসায়নিক নয়, বরং মানুষের পরিচিত স্বাদেরই একটি ঘনীভূত রূপ।
MSG নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় ১৯৬৮ সালে, যখন একজন ডাক্তার চীনা খাবার খাওয়ার পর দুর্বলতা ও ঝিমুনি অনুভব করার কথা লেখেন। এরপর “Chinese Restaurant Syndrome” নামটি চালু হয়, যা পরে “MSG Symptom Complex” নামে পরিচিত হয়।
মিডিয়ার অতিরঞ্জন ও কিছু দুর্বল গবেষণার কারণে মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হয় যে MSG মাথাব্যথা, মুখ লাল হওয়া বা অন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু বহু বছর ধরে করা শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক গবেষণায় MSG-এর সাথে এসব সমস্যার কোনো নিশ্চিত সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
অনেক পরীক্ষায় দেখা গেছে, MSG খেলে এবং প্লাসেবো (নকল উপাদান) খেলে মানুষের প্রতিক্রিয়ায় কোনো পার্থক্য নেই। শুধু খুব বেশি পরিমাণে (প্রায় ৩ গ্রাম বা তার বেশি, খালি পেটে) খেলে সামান্য সমস্যা হতে পারে। কিন্তু সাধারণ খাবারে MSG থাকে এর চেয়ে অনেক কম—সাধারণত আধা গ্রামেরও কম।
আধুনিক পুষ্টিবিদরা মনে করেন, যে অস্বস্তির কথা বলা হয় তা আসলে অন্য খাবারের উপাদান বা মানুষের মানসিক প্রভাব (placebo effect) থেকেও হতে পারে, MSG থেকে নয়।
MSG নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মত হলো—স্বাভাবিক পরিমাণে এটি নিরাপদ। কিছু পুরনো প্রাণী গবেষণায় ঝুঁকির কথা বলা হলেও সেগুলোতে অস্বাভাবিকভাবে বেশি ডোজ ব্যবহার করা হয়েছিল, যা মানুষের খাদ্যের সাথে মেলে না।
মানুষের খাদ্য থেকে আসা গ্লুটামেট সাধারণত হজমতন্ত্রেই ভেঙে যায় এবং খুব কমই মস্তিষ্কে পৌঁছায়। সত্যিকারের অ্যালার্জি খুবই বিরল।
বর্তমানে MSGকে স্বাস্থ্যকর ও টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার সহায়ক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এটি শাকসবজির স্বাদ বাড়াতে সাহায্য করে, ফলে মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার বেশি খেতে পারে। এছাড়া এটি লবণের ব্যবহার কমাতে সাহায্য করে, যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে উপকারী।
অনেক দেশে MSG ব্যবহার করে কম লবণযুক্ত খাবারকে আরও সুস্বাদু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি খাদ্য অপচয় কমাতেও সাহায্য করে।
তবে এখনো অনেক মানুষ MSG নিয়ে ভুল ধারণা রাখে। অনেক সময় “No Added MSG” লেখা পণ্যকে বেশি স্বাস্থ্যকর মনে করা হয়, যদিও অন্য খাবারে স্বাভাবিকভাবেই গ্লুটামেট থাকে।
এই ভুল ধারণা অনেকটা সাংস্কৃতিক পক্ষপাত থেকেও এসেছে, বিশেষ করে এশিয়ান খাবারের ক্ষেত্রে। কিন্তু সত্য হলো, MSG কোনো বিষ নয়, বরং নিরাপদ ও প্রাকৃতিকভাবে তৈরি একটি স্বাদবর্ধক উপাদান।
অনেক পুষ্টিবিদ ও গবেষক এখন মানুষকে MSG সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সারসংক্ষেপে, MSG একসময় “ক্ষতিকর” বলে ভাবা হলেও বিজ্ঞান বলছে—সাধারণ পরিমাণে এটি নিরাপদ এবং উপকারীও হতে পারে।
এটি খাবারের স্বাদ বাড়ায়, লবণ কমাতে সাহায্য করে এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই ভয় নয়, বরং সঠিক জ্ঞান নিয়ে MSGকে দেখা উচিত—একটি নিরাপদ ও কার্যকর ফ্লেভারিং উপাদান হিসেবে।
লেখক: স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, এন্টিঅক্সিডেন্ট পাথওয়েজ।