শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২
ছবি-সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা শাসনের জন্য একটি বোর্ড অব পিস বা শান্তি পরিষদ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এটি ইসরায়েলের হাতে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান গণহত্যা বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। খবর তুরস্কের সংবাদ সংস্থা টিআরটি গ্লোবালের।
ট্রাম্প তার নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘এটি ঘোষণা করতে পারা আমার জন্য বিরাট সম্মানের, বোর্ড অব পিস গঠিত হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, এই পরিষদের সদস্যদের নাম ‘শিগগির’ ঘোষণা করা হবে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এটি সর্বকালের, যেকোনো সময় ও যেকোনো স্থানে গঠিত সবচেয়ে মহান ও মর্যাদাপূর্ণ পরিষদ।’
এই ঘোষণার কিছুদিন আগেই ১৫ সদস্যের একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী গাজায় দৈনন্দিন শাসন ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই কমিটিকে। এই কমিটি ‘শান্তি পরিষদের’ তত্ত্বাবধানে কাজ করবে। ধারণা করা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন।
পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, গাজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন করা হবে। একই সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা ফিলিস্তিনি পুলিশ ইউনিটগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। হামাসের শীর্ষ নেতা বাসেম নাইম বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এখন বলটি মধ্যস্থতাকারী, মার্কিন গ্যারান্টর এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোর্টে। তাদেরই কমিটিকে ক্ষমতায়ন করতে হবে।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বুধবার এক্সে এক পোস্টে ঘোষণা করেন, ‘সংঘাত বন্ধে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে। এটি এখন যুদ্ধবিরতি থেকে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাট শাসন এবং পুনর্গঠনের দিকে এগোচ্ছে। পরবর্তী ধাপের লক্ষ্য হলো গাজার পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এবং পুনর্গঠন, বিশেষ করে সকল অননুমোদিত কর্মীদের নিরস্ত্রীকরণ।’ এটি মূলত হামাসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যারা এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
এই পরিকল্পনায় গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যাচাইকৃত ফিলিস্তিনি পুলিশ ইউনিটকে প্রশিক্ষণ দিতে একটি ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ মোতায়েনের আহ্বান জানানো হয়েছে। ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ নামক ১৫ সদস্যের একটি টেকনোক্র্যাট কমিটি গাজার দৈনন্দিন শাসন পরিচালনা করবে। তবে গাজা থেকে ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহারসহ বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। রামাল্লাভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী আলী শাথকে এই কমিটির নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, কমিটিটি এখন গাজায় প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে মিসরে বৈঠক করছে।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে আলী শাথ বলেছেন, ‘এই কমিটি অস্ত্রের পরিবর্তে মেধার ওপর নির্ভর করবে এবং কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করবে না।’ হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা বাসেম নাইম বৃহস্পতিবার এই কমিটি গঠনকে স্বাগত জানিয়েছেন। একে ‘সঠিক দিশায় একটি পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীটি গাজার প্রশাসন হস্তান্তর করতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি সুসংহত করতে, যুদ্ধে ফিরে আসা রোধ করতে, ভয়াবহ মানবিক সংকট মোকাবিলা করতে এবং ব্যাপক পুনর্গঠনের প্রস্তুতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ মাঠপর্যায়ে বুলগেরিয়ার কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ নিকোলে ম্লাদেনভের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের ব্যক্তিগতভাবে মনোনীত সম্ভাব্য ‘বোর্ড অব পিস’ সদস্যদের কাছে বুধবার আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গাজা শান্তি পরিকল্পনাটি প্রথম কার্যকর হয় গত বছরের ১০ অক্টোবর। এই পরিকল্পনার আওতায় হামাসের হাতে আটক সব বন্দীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং গাজায় গণহত্যার অবসান ঘটে। তবে এরপরও ইসরায়েল চুক্তি ভঙ্গ করে গাজায় শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। ফিলিস্তিনিদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। এই বিষয়টি পরিকল্পনার কাঠামোর মধ্যে থাকলেও এর জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৪০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ। বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষকের মতে, আংশিকভাবে ইসরায়েল-অধিকৃত এই ভূখণ্ডে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ হতে পারে।
গত ১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও ইসরায়েল গাজায় হামলা চালানো অব্যাহত রেখেছে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে তারা আরও ৪৫১ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষকে আহত করেছে।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)