বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩


ছয় দশকের অপেক্ষা শেষে অনুমোদন পেল 'পদ্মা ব্যারাজ' প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:১৩ মে ২০২৬, ১৫:৩৩

ছবি ‍: সংগৃহীত

ছবি ‍: সংগৃহীত

অবসান হলো প্রায় ছয় দশকের অপেক্ষার। অনুমোদন পেল দেশের বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রকল্পটির প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানির ঘাটতি মোকাবিলা, নদীব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সামগ্রিক পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিশ্চিত করা। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মিতব্য ব্যারাজে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করবে।

প্রকল্পের আওতায় জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ইছামতি-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রিত পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে গোদাগাড়ী পাম্প হাউস, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলার প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে।

প্রকল্পের মাধ্যমে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ব্যারাজের ওপর সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে এটিকে বহুমুখী করিডর হিসেবে ব্যবহার করা হবে। প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এর ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান এবং ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নকালে প্রায় ১২ কোটি ২৫ লাখ কর্মদিবসের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যেখানে প্রায় ৪৭ হাজার ৯৫০ জন শ্রমিক কাজের সুযোগ পাবেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ৩ হাজার ৪৫০ একর জমিতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের জন্য সাতটি উপগ্রহ শহর ও আধুনিক গ্রামীণ টাউনশিপ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যেতে পারে এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রায় শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন কমিয়ে সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং দেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্রীয় সমাধান হতে পারে। তারা বলেন, এই ব্যারাজের মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং কৃষি, মৎস্য, শিল্প ও পরিবেশ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

উনিশ শতকের সত্তরের দশকে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর থেকে উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ও খালে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়, যা কৃষি, মৎস্য, বনজ সম্পদ ও নৌপথের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও এর ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে।

প্রকল্পটি দেশের মোট ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ অঞ্চলে প্রভাব ফেলবে। চারটি বিভাগ, ২৬টি জেলা এবং ১৬৩টি উপজেলায় এর সুফল পৌঁছাবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের আগে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা-গঙ্গা ব্যবস্থায় পানির প্রবাহ ছিল প্রায় ৭০ হাজার কিউসেক। ১৯৭৫ সালের পর উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে অনেক সময় তা ২০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে এসেছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে পদ্মানির্ভর ২০ থেকে ২৫টি জেলার মানুষের জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে গত জানুয়ারিতে প্রায় ছয় দশকের আলোচনার পর প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। ২৫ জানুয়ারির একনেক সভায় এটি উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও উচ্চ ব্যয়ের কারণে তড়িঘড়ি অনুমোদন না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করে প্রথম ধাপে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অনুমোদনের প্রস্তাব দেয়। সরকারি অর্থায়নে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত ৬ মে পরিকল্পনা কমিশন ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। এ সময় প্রকল্পটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে কী ধরনের অবদান রাখবে, সেই মূল্যায়ন প্রস্তাবে যুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি পানি নির্গমন পথ, ১৮টি নিম্নস্রোত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, মাছ চলাচলের বিশেষ পথ, নৌযান চলাচলের লক এবং নদীতীর রক্ষাবাঁধ। গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর জন্য তিনটি পানি গ্রহণ কাঠামো নির্মাণ করা হবে।

নদী ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে গড়াই-মধুমতি ব্যবস্থায় ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার খনন এবং হিসনা নদী ব্যবস্থায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যারাজের মাধ্যমে ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জলাধার তৈরি হবে, যেখানে অতিরিক্ত বড় ধরনের ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। এর ফলে পর্যটন, মৎস্যসম্পদ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাশাপাশি জলবিদ্যুতের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নদীর দুই তীরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দুই দেশ পানি ভাগাভাগি করে আসছে। ৩০ বছর মেয়াদি ওই চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর শেষ হচ্ছে।

প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়েছে, পদ্মায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি, মৎস্য, বনজ সম্পদ, নৌপরিবহন, পানীয় জলের সরবরাহ এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মিঠা পানির ঘাটতির কারণে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতির মুখে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে আশপাশের নদী ও খালে অতিরিক্ত লবণাক্ততা সৃষ্টি হয়েছে।

পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি এবং চন্দনা-বারাশিয়া নদীতে পলি জমে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ পানি সরাসরি বঙ্গোপসাগরে চলে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ নদীগুলো প্রায় শুকিয়ে যায়। এতে লবণাক্ততা, নদীভাঙন, পলি জমা, নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়া, সেচ সংকট এবং মৎস্য উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো সমস্যা বেড়েছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনের গাছপালায় ব্যাপক মরা রোগও দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা প্রথম উঠে আসে ষাটের দশকে। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বর্তমান বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রথম সমীক্ষা শুরু করে। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে চারটি প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালিত হয়।

২০০২ সালে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ী অথবা রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে। পরবর্তীতে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন করা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত থাকে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন ও ঢাকায় বৈঠক করেন। পরে তথ্য বিনিময় সহজ করতে একটি যৌথ কারিগরি উপকমিটিও গঠন করা হয়।

 

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৩:৫৪ - ৫:১২ ভোর
যোহর ১১:৫৫ - ৪:২৩ দুপুর
আছর ৪:৩৩ - ৬:২৭ বিকেল
মাগরিব ৬:৩২ - ৭:৫০ সন্ধ্যা
এশা ৭:৫৫ - ৩:৪৯ রাত

বুধবার ১৩ মে ২০২৬