শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২


পাখির চোখে আগামীর সড়ক ব্যবস্থাপনা

কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ

প্রকাশিত:২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:৩১

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

আচমকা হইচই-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের ডান পাশের বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে বসা চিলদের মধ্যে কিছুটা অস্থিরতা দেখা গেল। বেশ কয়েকটা চিল বিরক্তি নিয়ে উড়ে চলে গেল। এ জায়গাটা তাদের সারাদিন শেষে একটু বিশ্রামের জায়গা। কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে রাত ১২টা থেকেই প্রচুর আলো আর মানুষের আনাগোনায় সেভাবে কারো বিশ্রাম হয়নি।

তবে এরা প্রায় সবাই এসবে অভ্যস্ত হলেও দলের বাইরে থাকা এক শঙ্খচিল বিষয়গুলো দেখছিল আগ্রহ নিয়ে। ঢাকায় তার প্রথম আসা। প্রায় ১৬ বছর ধরে সে শুধু উড়ে বেড়িয়েছে পৃথিবী বিভিন্ন প্রান্তরে। চিল সমাজে এটা খুব একটা দেখা যায় না কিন্তু তার শখ সে দুনিয়া দেখবে। অনেক উপরে থাকার একটা সুবিধা হলো অন্য সবাই যা দেখে না সেটা সে সহজেই দেখতে পারে।

এক সপ্তাহ ধরে সে ঢাকার আকাশে উড়ে বেড়িয়েছে, অনেক কিছুই দেখেছে। গত রাতে সবাই যখন শহীদ মিনারে ফুল দিচ্ছিল তখন তার খুব ভালো লাগছিল এই ভেবে যে, এ মানুষগুলো ভাষা শহীদদের জন্য কতটা ভালোবাসা রাখে।

অন্যদিকে এ শহরের মানুষগুলো দেখে তার মনে হয়েছে এদের সামনে একটা বড় সমস্যা আছে। এই মানুষগুলো পৃথিবীর অন্য দেশের তুলনায় দ্রুত অসুস্থ হয়ে যাবে কারণ এ শহরের মানুষ দিনের বেশিরভাগ সময় রাস্তার যানজটে কাটিয়ে দিচ্ছে। এই যানজটে পড়ে গাড়িগুলো কালো ধোঁয়া ছাড়ছে, ইচ্ছামতো হর্ন দিচ্ছে, গাড়ির ভেতরে যাত্রীরা ঘেমে অস্থির হচ্ছে, রাস্তার পাশে ফুটপাত ঠিকমতো নেই যে কেউ হেঁটে যাবে।

আস্তে আস্তে এরা হারাচ্ছে কর্মঘণ্টা, কর্মশক্তি, শ্রবণশক্তি, হারাচ্ছে তার সামাজিক সম্পর্ক আর পরিবারের জন্য বরাদ্দ করা সময়। অথচ সে অনেক দেশে দেখেছে কীভাবে সরকার যানজট কমিয়ে একটা সুস্থ শহর নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

তারা পথচারী আর সাইকেলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে রাস্তায় ডিজাইন করেছে আর এমনভাবে সড়ক ব্যবস্থাপনা করেছে যেন অনেক মানুষ একসাথে যেতে পারে এ ধরনের গাড়ি যেমন বাস, মিনিবাস এর অগ্রাধিকার থাকে। কিন্তু এ শহরের চিত্র তার কাছে একেবারেই ভিন্ন মনে হচ্ছে।

এখানে যেন সবাই ছোট গাড়ির জন্য এই শহরকে সাজাচ্ছে আর পায়ে হাঁটা আর সাইকেলে চলার বিষয়টা করছে কঠিন। এত যানজট, এত সড়ক দুর্ঘটনা-গতরাত থেকে কত নীতিনির্ধারকরা এখানে এসেছে কিন্তু যদি সে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারত, তাহলে হয়তো ঢাকা শহরের সমস্যাগুলো শূন্য থেকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যেত।

শঙ্খচিলের মনে হলো, ইউরোপে যখন সে ঘুরে বেড়াত, তখন শহরের অনেক জায়গায় বাইসাইকেল ব্যবহারের জন্য আলাদা রাস্তা দেখেছিল। পথচারী এবং বাইসাইকেলকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তাদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। বাস স্টেশন, মেট্রো স্টেশনসহ সব জায়গায় সাইকেল স্ট্যান্ড আছে।

যে শহরগুলোয় বাইসাইকেল ফ্রেন্ডলি রাস্তা তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোয় পরিবহন ব্যবস্থা অনেক বেশি শান্তিপূর্ণ। চিল চিন্তা করতে লাগল, ঢাকায় যদি বাইসাইকেল ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট লেন তৈরি করা যায়, বিশেষত সিটি সেন্টার ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয়, তবে যানজট কমবে এবং পরিবেশও উন্নত হবে।

ঢাকা শহরে বাইসাইকেল ব্যবহারের জন্য যেমন একটি সিস্টেম তৈরি করা যেতে পারে, তেমনই বাইসাইকেল শেয়ারিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে, যেখানে প্রতিদিন নতুন বাইসাইকেল ব্যবহারকারীরা বাইসাইকেল নিতে পারবেন। এতে শহরের পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে এবং এভাবে শহরের পরিবেশও আরও সুরক্ষিত হবে।

এছাড়া ফুটপাত ব্যবস্থাপনা খুব জরুরি। ঢাকায় ফুটপাত দখল করে বসে থাকা হকাররা যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের প্রধান সড়কগুলো ফুটপাত মুক্ত করা এবং ফুটপাতের নিরবচ্ছিন্নতা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কয়েকবছর আগে নিউইয়র্কয়ের আকাশে যখন সে উড়ছিল তখন একটা ব্যাপার তার খুব নজর কেড়েছে সেটা হচ্ছে ওই শহরেও যানজট আছে কিন্তু রাস্তার প্যাটার্নটা হলো গ্রিড প্যাটার্ন। এর ফলে একই জায়গায় যেতে বিভিন্ন রুট পাওয়া যায়, আর মেট্রো সিস্টেমটা জালের মতো ছড়ানো।

সেখানে পার্কিং চার্জ এত বেশি যে মানুষ গাড়ি বের করার আগে তিনবার ভাবে। কিন্তু ঢাকায় বিষয়টা উল্টো। এখানে কেউ যেকোনো জায়গায় এমনকি রাস্তার সংযোগস্থলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও পার্কিং করে রাখে। এমনিতেই রাস্তা কম তার উপরে যেখানে সেখানে পার্কিং করার সুবিধা মানুষকে ছোট গাড়ি ব্যবহারে উৎসাহিত করে আর যানজট বাড়ায়। এ শহরে পার্কিং ব্যবস্থাপনা কঠিন করা প্রয়োজন।

আবার লন্ডন শহরের যে বিষয়টা তার চোখে লেগেছে সেটা হলো ওই শহরের যানজট কমাতে তারা সেন্ট্রাল লন্ডনের কিছু এলাকায় ‘কংজেশন চার্জ’ সিস্টেম চালু করেছে, যার মাধ্যমে যানবাহন নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে প্রবেশ করলে একটি নির্দিষ্ট ফি প্রদান করতে হয়। এর ফলে শহরের যানজট অনেকটা কমেছে।

ঢাকাতেও এই ধরনের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে শহরের ব্যস্ত এলাকায় যানবাহনের সংখ্যা কমবে এবং রাস্তার অবস্থা উন্নতি হবে। লন্ডনের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমও অত্যন্ত উন্নত। মেট্রো, বাস এবং রেল সিস্টেমগুলো একে অপরের সঙ্গে সমন্বিত, যা শহরের যানজট কমাতে সহায়ক।

ঢাকা শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা ভালো করতে হলে বাস চলাচলও অগ্রাধিকার দিতে হবে। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে বাসের জন্য আলাদা লেন দিতে হবে কারণ যে মালিক দামি বাস দিয়ে ঢাকার বাইরে ব্যবসা করছেন তিনি ঢাকার মতো চাহিদা সম্পন্ন জায়গায় আরও বেশি বিনিয়োগ করবে যদি সরকার তাকে পরিবেশ দেয়।

চাঁদাবাজি, হয়রানি বন্ধ করে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি সিস্টেম করলে বিনিয়োগ আসবে। তবে অনেক প্রভাবশালী অবশ্য এটাতে বাধা দিতে পারে কারণ সমস্যা থাকলে অনেকের জন্যই লাভ হয়। ঢাকা শহরে একাধিক পরিবহন ব্যবস্থা যেমন বাস, মেট্রো, রিকশা, বাইসাইকেল লেন, ট্রেন ইত্যাদি একে অপরের সঙ্গে সমন্বিত করা হলে এটি পুরো সিস্টেমকে আরও সহজ এবং দ্রুততর করবে। এই ব্যবস্থা মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম হিসেবে কাজ করবে, যেখানে যাত্রী এক ধরনের পরিবহন থেকে অন্য ধরনের পরিবহন সহজেই ব্যবহার করতে পারবে।

ইন্টারসেকশন ম্যানেজমেন্ট এই শহরে খুব জটিল কারণ এখানে প্রায় সব বড় বড় ইন্টারসেকশনে চারপাশে বড় বড় ভবন নির্মাণ করা হয়েছে যেগুলো একদিকে অনেক ট্রাফিক জেনারেট করে অন্য দিকে ভবিষ্যতে সংযোগস্থলের কোনো উন্নয়ন বা এক্সপানশন এর সুযোগ কমে গেছে।

তবে চাইলে এখনো কিছু স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব। যেমন কোনো অবস্থাতেই সংযোগস্থলের ১০০ মিটারের মধ্যে কোনো পার্কিং বা স্টপিং করা যাবে না এবং বাস স্টপ ছাড়া বাস থামা বন্ধ করতে হবে। এসব স্থানে ট্রাফিক সিগন্যালের উন্নতি, বৃত্তাকার এবং বিশেষ ট্রাফিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যানজট এবং সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে।

এছাড়াও ঢাকা শহরে ব্যাটারি চালিত রিকশার সংখ্যা অনেক বেড়েছে, যা শহরের যানজট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাই এসব রিকশার জন্য নির্দিষ্ট রাস্তা এবং এলাকা নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে, তাদের সীমা নির্ধারণ করে সঠিক লাইসেন্সিং ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা উচিত।

তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে কেন এত মানুষ ঢাকায় আসছে। শঙ্খচিল যখন ইউরোপ বা লন্ডনের আকাশে উড়ত তখন সে শহরগুলোর মাঝে পার্থক্য করতে পারত না। সবগুলো শহর ছিল একই মানসম্মত। কিন্তু এখানে বোঝা যায় যে সব উন্নয়ন বড় ২/১টা শহর কেন্দ্রিক।

ঢাকা শহর ছাড়া ভালো স্কুল, চিকিৎসা, চাকরি পাওয়া তো দূরের কথা এমনকি রিকশা চালিয়ে ভালো ইনকামও করা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে এ শহর কখনোই সুস্থ হবে না কারণ জোগান বাড়িয়ে কখনো চাহিদা কমানো যায় না বরং জোগানের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই চাহিদার ভারসাম্য করতে হয়।

কয়েকদিন ধরে তার মনে হচ্ছে এ শহরের সড়ক ব্যবস্থাপনার ভালো করার জন্য সরকারকে সঠিকভাবে গাইডলাইন দেওয়া হয় না। আজকে যেটা প্রয়োজন বলা হচ্ছে কাল ব্যক্তি পরিবর্তন হলে ভিন্ন প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। পরামর্শগুলো আসলে দীর্ঘমেয়াদি না বরং পরামর্শ কে নিচ্ছেন, তিনি কোন কথা বললে খুশি হবেন সেটা চিন্তা করা হয়। এভাবে সরকার বিভ্রান্ত হয়, কাজের অগ্রাধিকার বুঝতে পারে না।

আবার নিচে হইচই শুনে শঙ্খচিলের ভাবনায় ছেদ পড়ল। আরও অনেককিছুই হয়তো তার মনে ভেসে আসত কিন্তু নিচে তাকিয়ে দেখল যে এতক্ষণ ধরে শহীদ মিনারে মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় দেওয়া ফুলগুলো একদল মানুষ যে যেভাবে পারছে নিয়ে যাচ্ছে।

কয়েকজন স্কাউট প্রাণপণে তাদের থামাতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে জমা সব ফুল ১২ মিনিটেরও কম সময়ে হাতিয়ে নেওয়া দেখে শঙ্খচিলে এক গভীর নিঃশ্বাস ছাড়ল। সে জানতো, এই কাজ একা সরকারের পক্ষে সম্ভব না বরং এই শহর, এই দেশ এবং এই জনগণ যদি চায়। জনগণ যদি আইনের প্রতি, নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা রাখে তবে এগুলো সবই সম্ভব।

কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ : সহকারী অধ্যাপক, এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট, বুয়েট

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৫:০৮ - ৬:১৮ ভোর
যোহর ১২:১১ - ৪:১১ দুপুর
আছর ৪:২১ - ৫:৫৫ বিকেল
মাগরিব ৬:০০ - ৭:১০ সন্ধ্যা
এশা ৭:১৫ - ৫:০৩ রাত

শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬