বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২
ছবি : সংগৃহীত
স্বাধীনতার পর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সব দলই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা করেছিল। কিন্তু দুর্নীতি কি দেশে কমেছে? এর উত্তর দেশের জনগণের কাছেই আছে।
বিগত নির্বাচনগুলোর মতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা ছিল। নতুন সরকারও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট ভাষায় প্রশাসন থেকে রাজনীতি সর্বত্র স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে।
প্রশ্ন হলো, ঘোষণা থেকে বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব? আমার কাছে উত্তর হচ্ছে—রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা থাকলে অনেকটা সম্ভব। দুর্নীতি পুরোপুরি থামানো না গেলেও অনেকাংশে কমানো যায়।
আমাদের দেশে দুর্নীতি নতুন কোনো সমস্যা নয়। এটি কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং অনেক ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিকও হয়ে উঠেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া, নিয়োগ, ব্যাংক ঋণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা—সবখানেই অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ। ফলে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ কেবল কিছু ব্যক্তি বা ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়; পুরো ব্যবস্থার ভেতরের অসুখ শনাক্ত করে তার চিকিৎসা করা।
এখানে প্রথম বাধা রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বিরোধী দলে থাকাকালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা সহজ। কিন্তু ক্ষমতায় এসে নিজের দলের নেতা-কর্মী, জোটসঙ্গী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।
দুর্নীতি দমন যদি কেবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ার হয়, তাহলে তা টেকসই হবে না। মানুষ দ্রুত বুঝে ফেলে—আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান হচ্ছে, নাকি বেছে বেছে।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ প্রশাসনিক সংস্কার। এ খাতে সংস্কার জরুরি। সরকারি দপ্তরগুলোয় ফাইল আটকে রাখা, অনুমোদন বিলম্বিত করা—এসব দীর্ঘদিনের চর্চা। কেবল আইন কঠোর করলেই হবে না, কাজের প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। সেবাগুলো যত ডিজিটাল হবে, মুখোমুখি লেনদেন কমবে, তত অনিয়মের সুযোগও কমবে।
তবে এখন ডিজিটাল কারসাজির কথাও শোনা যায়। ডিজিটালাইজেশন তখনই ফল দেবে, যখন সেটি সত্যিকার অর্থে স্বয়ংক্রিয় ও নজরদারির আওতায় থাকবে।
তৃতীয় বিষয়টি হলো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ), মহাহিসাব নিরীক্ষক—এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নির্ভর করে তাদের স্বাধীনতা ও সক্ষমতার ওপর।
যদি নিয়োগ প্রক্রিয়া বিতর্কিত হয় বা রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে, তাহলে বড় অনুসন্ধান-তদন্ত বা দুর্নীতির মামলা সামনে এগোয় না। নতুন সরকারের জন্য তাই বড় পরীক্ষা হবে—এই প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ রাখা যায়।
অতীতে এসব প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছিল, যেমন দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে বলে আগের সরকারগুলোর পক্ষ ঢোল বাজানো হতো। বাস্তবে দেশের সাধারণ মানুষও বুঝতো এ প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতো কি না!
ব্যাংক খাতের কথাও আলাদা করে বলতে হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঋণখেলাপি ও অনিয়ম নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। প্রভাবশালীদের জন্য ‘পুনঃ তফসিল’ আর সাধারণ ব্যবসায়ীর জন্য কড়াকড়ি—এই দ্বৈত নীতি আস্থা নষ্ট করে। ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, পরিচালনা পর্ষদে জবাবদিহি এবং বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড নিশ্চিত না করলে দুর্নীতি দমনের অঙ্গীকার কাগুজেই থেকে যাবে।
রাজনৈতিক অর্থায়নও একটি নিদারুণ বাস্তবতা। নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের সংস্কৃতি থাকলে ক্ষমতায় এসে সেই অর্থ ‘উসুল’ করার চাপ তৈরি হয়। দলীয় অর্থায়নের স্বচ্ছ কাঠামো না থাকলে দুর্নীতি কমানো কঠিন।
সরকার চাইলে রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে পারে, নিরপেক্ষ নিরীক্ষা চালু করতে পারে। এতে শুরুতে অস্বস্তি থাকবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতিকে স্বচ্ছ করবে।
সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আসছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার নির্বাচনী সুশাসন নিশ্চিতের চেষ্টা করতে পারে। কেবল দমন নয়, প্রতিরোধও জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের চর্চা বাড়াতে হবে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং পুরস্কার–শাস্তির স্পষ্ট নীতি দরকার। ভালো কাজের স্বীকৃতি না থাকলে কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা যায় না।
আরেকটি বাস্তবতা হলো বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা। বড় দুর্নীতির মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে বার্তা যায়—শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, সময়সীমা নির্ধারণ, প্রযুক্তির ব্যবহার—এসব দিয়ে মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত করা যায়। শাস্তি নিশ্চিত না হলে আইনের ভয় কাজ করে না।
নতুন সরকার যদি সত্যিই ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে শুরুটা হতে পারে প্রতীকী কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ দিয়ে। যেমন নিজের দলের বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও তদন্তে ছাড় না দেওয়া; বড় প্রকল্পের সব চুক্তি প্রকাশ করা; সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা; মন্ত্রিসভা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী নিয়মিত প্রকাশ করা। মানুষ কথার চেয়ে কাজ দেখে বেশি বিশ্বাস করে।
সবশেষে প্রশ্নটি রাজনৈতিক। সরকার কি স্বল্পমেয়াদি সুবিধার বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে প্রস্তুত? দুর্নীতি দমন এক দিনের অভিযান নয়; এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এতে জনপ্রিয়তার ঝুঁকি আছে, ক্ষমতার ভেতরের অস্বস্তি আছে। কিন্তু সফল হলে লাভও বড়—আস্থা ফিরে আসে, বিনিয়োগ বাড়ে, রাষ্ট্রের সক্ষমতা শক্ত হয়।
মানুষ এখন ঘোষণার চেয়ে ফল দেখতে চায়। নতুন সরকারের সামনে তাই সুযোগ ও পরীক্ষা দুটোই সমান। তারা যদি সত্যিই দেখাতে পারে যে আইন সবার জন্য সমান তাহলে রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে থাকবে।
আর যদি প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে হতাশা আরও গভীর হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শেষ পর্যন্ত সরকারের একার নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়। কিন্তু নেতৃত্ব দিতে হবে সরকারকেই।
আদিত্য আরাফাত : অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর, ডিবিসি নিউজ
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)