শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
গত এক সপ্তাহের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জেলার দক্ষিণাঞ্চলের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় বন্যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বন্যার পানিতে টানা তিনদিন আটকে থাকলেও অনেক পানিবন্দি মানুষ সরকারি কিংবা বিত্তবানদের কাছ থেকে ত্রাণসামগ্রী পাননি।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে লাখো মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। কেউ উঁচু ভবনে, কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে দিন-রাত পার করছেন। শুক্রবার রাতের বৃষ্টির পর শনিবার সাতকানিয়ার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে তিনদিন পানিবন্দি থাকার পর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ত্রাণ সংকটের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। এরপর থেকেই সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করে।
দেশের অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে চট্টগ্রামের মানুষ যেভাবে সবার আগে এগিয়ে যান, সেই চট্টগ্রামের মানুষই এবার নিজেদের দুর্যোগে পর্যাপ্ত ত্রাণ না পেয়ে হতাশ হয়েছেন। সরকারি ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ক্ষোভও দেখা দিয়েছে।
এরই মধ্যে শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে বাঁশখালীর বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে যান জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেন। পরে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনো খাবার ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন।
অন্যদিকে, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা শুক্রবার সাতকানিয়া উপজেলার বন্যাকবলিত ঢেমশা ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি ৮০০ পরিবারের মধ্যে জরুরি ত্রাণ বিতরণ করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম।
চট্টগ্রামে টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিতে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। শুক্রবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের জরুরি অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা জেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর থেকে দুর্গত মানুষের দোরগোড়ায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়েছে। সাতকানিয়ার ভয়াবহ বন্যায় পানিবন্দি মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছেন সেনাসদস্যরা। উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
শনিবার সকাল থেকে উপজেলার বিভিন্ন প্লাবিত ইউনিয়নে এই কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়।
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক গ্রামের সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোমর থেকে বুকসমান পানির কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় নৌকাই এখন দুর্গত মানুষের একমাত্র ভরসা। এমন পরিস্থিতিতে সেনাসদস্যরা নৌকায় করে চাল, চিড়া, মুড়ি, বিশুদ্ধ পানিসহ জরুরি খাদ্যসামগ্রী বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, অনেক পরিবার কয়েক দিন ধরে ঘরবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বাজারে যাওয়া বা বাইরে থেকে খাদ্য সংগ্রহের সুযোগ না থাকায় অনেকেই খাদ্যসংকটে পড়েছেন। সেনাবাহিনীর ত্রাণ পৌঁছানোয় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
সাতকানিয়া উপজেলার স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সেনাবাহিনী, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা জানান, বন্যার পানিতে চারদিক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তারা কোথাও যেতে পারছিলেন না। সেনাসদস্যরা ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ায় তারা অনেকটা স্বস্তি পেয়েছেন।
এদিকে, আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত বন্যার্ত মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজন হলে আরও ত্রাণ ও উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে কার্যক্রম বিস্তৃত করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
শনিবার সকাল থেকে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের ত্রাণ কার্যক্রমও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আনোয়ারা ও চট্টগ্রাম নগর থেকে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী দল বাঁশখালীর দুর্গম গ্রামাঞ্চলে গিয়ে ত্রাণ বিতরণ শুরু করে।
বাঁশখালীর কাথারিয়া-বরইতলী এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী নাজিম উদ্দীন ছোটন বলেন, এখানে পরিস্থিতি খুবই খারাপ। অনেক ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের মুখে অন্তত কিছু খাবার তুলে দিতে।
বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দা নুর আনোয়ার বলেন, গত দুই দিন কেউ আসেনি। তবে আজ অনেকেই এসেছেন। মুড়ি, বিস্কুটসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী দিয়েছেন। কিন্তু অনেকের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। এই ক্ষতি সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
এদিকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ত্রাণ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে প্রশাসনের পাশাপাশি কোস্ট গার্ড, বিজিবি, আনসার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুর্গত মানুষও যাতে সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সরকার ও জেলা প্রশাসন বন্যার্ত মানুষের পাশে রয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত আছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সব বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতির সম্পূর্ণ উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। তিনি বিত্তবান ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।