সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পাথর আমদানি বন্ধ, দৈনিক রাজস্ব ক্ষতি ২ কোটি টাকা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে

প্রকাশিত:১৮ মে ২০২৬, ১৭:১৩

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

ট্যারিফ ভ্যালু (শুল্কায়ন মূল্য) নির্ধারণ নিয়ে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের একতরফা সিদ্ধান্তের জেরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর সোনামসজিদে। গত ১ মে থেকে বন্দরটি দিয়ে পাথর আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ভারতের মোহদিপুর এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন হঠাৎ করেই পাথরের এলসি (ঋণপত্র) মূল্য প্রতি টন ১৩ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৫ ডলার করার দাবি তোলায় এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

কোনো পূর্ব আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ আমদানি বন্ধ করে দেওয়ায় আমদানিকারকদের কোটি কোটি টাকা আটকে গেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ফল আমদানি বন্ধ থাকার পর এবার পাথর আমদানিও বন্ধ হওয়ায় বন্দরটিতে কার্যত শাটডাউন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে সরকার দৈনিক প্রায় ২ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বন্দরের প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক।

আমদানিকারক সাঈদী হাসান বলেন, পাথর আমদানি আমরা বন্ধ করিনি, ভারত বন্ধ করেছে। আমরা ১৩ ডলারে এলসি করে পাথর আনতাম। কিন্তু কোনো আলোচনা ছাড়াই তারা হঠাৎ ১৫ ডলারে এলসি করার দাবি জানিয়ে আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা সরকার নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী পণ্য আনি, তাই একতরফাভাবে দাম বাড়াতে পারি না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বসে আলোচনার মাধ্যমে দাম নির্ধারণ করলে আমরা তা মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু ব্যবসা বন্ধ রেখে আলোচনা হয় না। এভাবে চলতে থাকলে আমদানিকারকরা দেউলিয়া হয়ে পড়বেন।

সোনামসজিদ আমদানি-রপ্তানি গ্রুপের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর এবং পাথর আমদানির জন্য বিখ্যাত। এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০টি ট্রাকে পাথর আমদানি হতো। কিন্তু ভারতীয় রপ্তানিকারকরা ১৫ ডলারের কম দামে পাথর দিতে রাজি না হওয়ায় আমদানি বন্ধ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক উভয়পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ভারতীয় রপ্তানিকারকরা নমনীয় হয়ে আগের মতো ১৩ ডলারে পাথর সরবরাহ করুক, এটাই আমাদের দাবি।

আরেক আমদানিকারক মো. নাসিম বলেন, গত ১ মে থেকে পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাথর আমদানির সঙ্গে শ্রমিক, ট্রাকচালকসহ অনেকের জীবিকা জড়িত। ঈদের আগে এই পরিস্থিতিতে তারা অনেক দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

সোনামসজিদ আমদানি-রপ্তানি গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আরিফ উদ্দিন ইতি বলেন, ভৌগোলিকভাবে ঝাড়খণ্ড প্রদেশের কালো পাথর উৎপাদনকেন্দ্র সোনামসজিদ বন্দরের কাছে হওয়ায় এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০টি ট্রাকে পাথর আমদানি হতো। রাজশাহী, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ সারা দেশে এই পাথরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ১ মে থেকে মোহদিপুর এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ১৫ ডলারের নিচে পাথর না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ অন্যান্য বন্দরে এখনো ১৩ ডলারেই আমদানি চলছে। পাথর খাতের সঙ্গে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই সোনামসজিদ বন্দরেও ১৩ ডলারে পাথর আমদানি পুনরায় চালু করার দাবি জানাচ্ছি।

বিপাকে বন্দর, কর্মহীন ৫ হাজার শ্রমিক

পাথর আমদানি বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে বন্দরে কর্মরত শ্রমিকদের ওপর। বন্দরকে কেন্দ্র করে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ছিল, যার মধ্যে সরাসরি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ শ্রমিক প্রতিদিন ট্রাক থেকে পাথর আনলোডের কাজ করতেন।

শ্রমিক ইব্রাহিম বলেন, এই বন্দরে এখন আর আগের মতো কাজ নেই। পাথর-ফল সব বন্ধ। আমরা বেকার হয়ে পড়েছি। কাজ না থাকলে সংসার চালাব কীভাবে?

রইস উদ্দিন নামে আরেক শ্রমিক বলেন, আগে ফল আমদানি বন্ধ হয়েছে, এখন পাথরও বন্ধ। প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ শ্রমিক বেকার হয়ে দিন পার করছি। কোনো আয়-রোজগার নেই।

শ্রমিক হারুন বলেন, এই বন্দরে প্রায় ১০ বছর ধরে কাজ করছি। আগে ভালো কাজ ছিল। কিন্তু এখন ফল, পাথর, পেঁয়াজ কিছুই ঢুকছে না। সবকিছু স্বাভাবিক হোক, পণ্য প্রবেশ করুক—এটাই আমাদের অনুরোধ।

ফলের পর পাথর বন্ধ, থমকে গেছে পানামা পোর্ট

সোনামসজিদ বন্দরটি মূলত পাথর, পেঁয়াজ ও ফল—এই তিনটি প্রধান পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু গত তিন-চার বছর ধরে এই বন্দর দিয়ে ফল আমদানি বন্ধ রয়েছে। মাঝে মাঝে কিছু পেঁয়াজ আমদানি হলেও একমাত্র সচল খাত ছিল পাথর, যা গত ১ মে থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে থমকে গেছে পানামা পোর্ট।

সোনামসজিদ পানামা পোর্ট লিংকের ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম বলেন, এই বন্দরটি পাথর, পেঁয়াজ ও ফলের জন্য পরিচিত। কিন্তু তিন-চার বছর ধরে ফল ও পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ। আর ১ মে থেকে বন্ধ হয়েছে পাথর। অন্যান্য বন্দরে ১৩ ডলারে আমদানি চলছে, তাই এখানকার আমদানিকারকরাও ১৫ ডলারে রাজি নন। আগে যেখানে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০টি পণ্যবাহী ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করতো, সেখানে এখন মাত্র ২০ থেকে ৩০টি অন্যান্য পণ্যের ট্রাক আসছে। এতে বন্দরের ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ শ্রমিক অত্যন্ত কষ্টে দিন পার করছেন এবং সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।

এদিকে আমদানি বন্ধ থাকায় কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে।

সোনামসজিদ স্থলবন্দর কাস্টমসের রেভিনিউ অফিসার রাজু মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ভারতীয় রপ্তানিকারকরা ১৫ ডলারে এলসি করার দাবি জানিয়েছেন, কিন্তু আমাদের বন্দরে প্রচলিত দাম ১৩ ডলার। বাংলাদেশি আমদানিকারকরা ১৫ ডলারে রাজি না হওয়ায় আপাতত পাথর আমদানি বন্ধ আছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। আমরা আশাবাদী, শিগগিরই এর সমাধান হবে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৩:৫১ - ৫:১০ ভোর
যোহর ১১:৫৫ - ৪:২৩ দুপুর
আছর ৪:৩৩ - ৬:৩০ বিকেল
মাগরিব ৬:৩৫ - ৭:৫৪ সন্ধ্যা
এশা ৭:৫৯ - ৩:৪৬ রাত

সোমবার ১৮ মে ২০২৬