রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো বগুড়াতেও কয়েকদিন ধরে চলছে থেমে থেমে বৃষ্টি। রোববার (১২ জুলাই) দুপুর থেকে শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথাসহ বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় মাঝারি থেকে ভাড়ী বর্ষণ। বৈরী আবহাওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। তবে জীবিকার তাগিদে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই রাস্তায় নামতে হয়েছে দিন আনা দিন খাওয়া শ্রমজীবী মানুষদের।
তাদেরই একজন ৫৫ বছর বয়সী রিকশাচালক মো. গেদা মিয়া। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়নের চাচাইতারা গ্রামের মৃত করম উদ্দিনের ছেলে তিনি। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও সংসারের হাল ধরতে এখনো প্রতিদিন রিকশার প্যাডেল ঘোরাতে হয় তাকে।
বগুড়া শহরের সাতমাথায় রিকশার সিটে বসে ছিলেন গেদা মিয়া। শরীরজুড়ে ক্লান্তি, চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। যাত্রীর অপেক্ষায় বসে থাকা এই মানুষটি বললেন, শরীর দুর্বল, তাই বসে আছি। বৃষ্টিতে ভিজলে পরের দিন অসুস্থ হয়ে পড়ব। তাই ভিজছি না। আমার রিকশায় পলিথিন নেই, তাই যাত্রীরাও উঠতে চায় না। ভাড়া কম নিয়েও বসে থাকতে হচ্ছে।
কথা বলতে বলতেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন তিনি। জানান, দুই বছর আগে স্ত্রী রহিমা বেগম অভিমান করে বাবার বাড়িতে চলে গেছেন। মাঝে মধ্যে বাড়িতে এলেও সংসারের দায়িত্ব এখন প্রায় একাই বহন করতে হয় তাকে। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন। ছোট ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি অটোরিকশা চালালেও বাবার সংসারে নিয়মিত সহযোগিতা করেন না। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে, তারা ঢাকার পোশাক কারখানায় চাকরি করেন।
গেদা মিয়া বলেন, ঘরে বসে থাকলে তো পেট চলবে না। সপ্তাহে সপ্তাহে লোনের কিস্তি দিতে হয়। তাই শরীর খারাপ হলেও রিকশা নিয়ে বের হতে হয়। আজ সকাল থেকে শুধু একটা রুটি আর একটা কলা খেয়েছি। শরীর খুব দুর্বল লাগছে। বৃষ্টির দিনে সাধারণত আয় একটু বেশি হয়, কিন্তু আজ শরীর সায় দিচ্ছে না।
সাতমাথা ঘুরে দেখা যায়, গেদা মিয়ার মতো আরও অনেক রিকশাচালক বৃষ্টির মধ্যে ভিজে কিংবা পাতলা রেইনকোট গায়ে দিয়ে যাত্রী পরিবহন করছেন। কেউ আবার যাত্রীর আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। বৈরী আবহাওয়ায় তাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে গণপরিবহনের সংকটে সাধারণ মানুষ যখন দুর্ভোগে পড়েছেন, তখন এই রিকশাচালকরাই হয়ে উঠছেন অনেকের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই ভরসার পেছনে লুকিয়ে আছে অসুস্থ শরীর, ক্ষুধা, ঋণের বোঝা আর পরিবার বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর সংগ্রাম।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন গেদা মিয়ার মতো মানুষের জীবনে আরও এক নতুন পরীক্ষার নাম। তবুও থেমে থাকে না তাদের জীবন। কারণ দিনের শেষে রিকশার চাকার সঙ্গে ঘুরে চলে তাদের স্বপ্ন, পরিবারের অন্ন আর বেঁচে থাকার লড়াই।