শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩


রাজউক চেয়ারম্যান

‘রিহ্যাব-রাজউক ইন্সপেক্টর ও ভবন মালিকদের যৌথ প্রযোজনায় অনিয়ম হচ্ছে’

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:৮ আগষ্ট ২০২৬, ১৭:১৫

ছবি-সংগৃহীত

ছবি-সংগৃহীত

রাজধানীতে ভবন নির্মাণ ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে রিহ্যাব, রাজউক ইন্সপেক্টর ও ভবন মালিকদের মধ্যে যৌথ প্রযোজনায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম।

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ, আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু রাজউককে দায়ী করলে হবে না। ভবন মালিক, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং নকশা ও নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলী-স্থপতিদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বাস্তবে বিভিন্ন পক্ষের যৌথ প্রক্রিয়ার মধ্যেই অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, রিহ্যাব, ভবন মালিক ও রাজউকের ইন্সপেক্টর এই তিন পক্ষের যৌথ প্রযোজনায় অনিয়মগুলো হয়। সত্যি কথা বলছি, এই পরিস্থিতি রয়েছে। তবে কাউকে দোষারোপের উদ্দেশ্য করে নয়, বরং সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজউকের কোনো ইন্সপেক্টর অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মিত ভবনকে নিয়ম মেনে না চলেও ছাড়পত্র দিলে তার নিজেরই জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন এবং কারও কারও বিরুদ্ধে চাকরিসংক্রান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে রাজউকে যে সংখ্যক ইন্সপেক্টর থাকার কথা, বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে সেই সংখ্যা কমে এসেছে। তবে অনিয়ম বন্ধে কর্মকর্তাদের শাস্তির পাশাপাশি তাদের মোটিভেটও করা হচ্ছে।

ভবন নির্মাণে নকশা পরিবর্তনের বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, কোনো ভবনের অনুমোদন ছয় তলার জন্য হলে সেটিকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ১০ তলা করে পরে শুধু জরিমানা নিয়ে বৈধ করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। প্রয়োজনীয় অ্যাসেসমেন্ট ও কারিগরি যাচাই ছাড়া এ ধরনের ভবন অনুমোদন করা হলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে ভবনের নকশা, মাটির গুণগত মান, নির্মাণ কাজের তদারকি এবং ভবন ব্যবহারের অনুমোদন— সবকিছুতেই নিয়ম মানতে হবে। নকশা প্রণয়নকারী প্রকৌশলী ও স্থপতিদেরও নির্মাণকাজের বাস্তবায়ন ও তদারকিতে দায়িত্ব নিতে হবে।

রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, এই কাজ একদিনে শেষ হবে না। যখন থেকে ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে, তখন থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম চলে আসছে। আমরা এখন ধাপে ধাপে সেগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি।

ভবন মালিক ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ম মেনে নির্মাণ কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণকে সচেতন হতে হবে এবং অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে অনিয়মের তথ্য গণমাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।

রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ভবন নির্মাণের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে নিয়মিত ভূমিকা রাখতে হবে। প্রকৌশলী ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের স্বার্থ ও জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ডেভেলপারদের সহযোগিতা করতে হবে। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ভবনের নকশা ও নির্মাণ নিশ্চিত করা গেলে টেকসই ও নিরাপদ ভবন নির্মাণ সম্ভব।

আব্দুর রাজ্জাক আরও বলেন, ব্যবসায়িক স্বার্থের পাশাপাশি রাষ্ট্র, সমাজ ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে ভবন নির্মাণ খাতকে আরও নিরাপদ ও জনবান্ধব করার আহ্বান জানান তিনি।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ভবনের নকশা বা নির্মাণ মানের ওপর নির্ভর করে না, ভবনটি কোথায় এবং কী ধরনের মাটির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল ও জলাভূমি এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

তিনি বলেন, দুর্বল মাটির ওপর ভবন নির্মাণ বন্ধে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভবনের নকশা ও নির্মাণ তদারকির পাশাপাশি নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ঢাকায় অনুমোদিত ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণের বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাজউকের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কোথাও কোথাও ছয়তলা অনুমোদন নিয়ে ১০ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এসব ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত পরিদর্শনের জন্য রাজউক চেয়ারম্যানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ঢাকার প্রায় ছয় লাখ ভবনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। শুধু ভূমিকম্পের সময় সচেতনতা নয়, সারা বছর গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক সংবাদ প্রচার করতে হবে।

মাইনুল হাসান সোহেল আরও বলেন, আগাম প্রস্তুতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা গেলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। এজন্য রাজউক, গণমাধ্যম ও নাগরিকদের নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক সালেহ উদ্দিন বলেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় কোনো একক সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়, সমন্বিতভাবে সব স্টেকহোল্ডারকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, ভূমিকম্পের পর উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত পরিচালনায় ফায়ার সার্ভিসের কিছু প্রস্তুতি রয়েছে। ঢাকার আশপাশের ৪১টি ফায়ার স্টেশনকে এয়ারমার্ক করা হয়েছে এবং বিশেষ রেসপন্স টিমও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে এসব প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

সালেহ উদ্দিন আরও বলেন, ভূমিকম্পে মানুষ সরাসরি মারা যায় না, বরং ভবন ও স্থাপনা ধসে পড়েই প্রাণহানি ঘটে। তাই ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ও সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলার পাশাপাশি ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, কমিউনিটি ও জাতীয় পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডুরা) সভাপতি শাহজাহান মোল্লা বলেন, ঢাকাসহ সারাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি নিয়ে নানা তথ্য তুলে ধরছে। এসব তথ্যের আলোকে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের কী করণীয় এবং কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়, সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।

শাহজাহান মোল্লা বলেন, গণমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক তথ্য তুলে ধরে সরকার ও রাজউকের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে সহযোগিতা করা সম্ভব। এ লক্ষ্যেই ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও করণীয় নিয়ে এ ধরনের আলোচনা আয়োজন করা হয়েছে।

তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

উক্ত অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী। অনুষ্ঠানে সঞ্চালনায় ছিলেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। উক্ত অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডুরার প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিরাজ মাহবুব ইফতি, সিনিয়র সাংবাদিক রিপন তালুকদার প্রমুখ।

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৪:১০ - ৫:২৬ ভোর
যোহর ১২:০৪ - ৪:৩১ দুপুর
আছর ৪:৪১ - ৬:৩২ বিকেল
মাগরিব ৬:৩৭ - ৭:৫৩ সন্ধ্যা
এশা ৭:৫৮ - ৪:০৫ রাত

শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬