রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তন শুধুই পালাবদল নয় বরং এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙনের ইঙ্গিত দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় দলটির একসময়কার শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তির পতনের দিকেই নির্দেশ করছে। এতে দলটি তার শীর্ষ নেতৃত্বের বাইরে টিকে থাকতে পারবে কি না— সে বিষয়ে মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে ব্যাপক তোলপাড়। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে ব্যাপক রদবদল। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, সাংগঠনিক দুর্বলতা, স্থানীয় স্তরে অসন্তোষ এবং বিরোধীদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব— সব মিলিয়েই এই পরাজয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
দলের চেয়ারপারসন মমতা ব্যানার্জি ফল ঘোষণার পরপরই পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বসেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, দলকে নতুনভাবে সাজাতে হবে, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। এরই অংশ হিসেবে জেলা ও ব্লক স্তরের একাধিক সভাপতিকে সরিয়ে নতুন মুখ আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক ব্যানার্জি সংগঠন ঢেলে সাজানোর দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছেন। তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা, ডিজিটাল প্রচার জোরদার করা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় করার ওপর তিনি জোর দিচ্ছেন।
এই বিপর্যয়ের কেন্দ্রে শুধু ক্ষমতাবিরোধী মনোভাব (অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি) বা বিজেপি’র উত্থান নয়; বরং দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর—‘মিডল অর্ডার’ এর ধীরে ধীরে ক্ষয় বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই স্তরই আগে মমতা ব্যানার্জির জনসমর্থনকে বুথ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণে রূপান্তর করত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘তৃণমূল শুধু একটি নির্বাচন হারেনি, তারা তাদের সাংগঠনিক স্মৃতিও হারিয়েছে। এটি কেবল নির্বাচনি পরাজয় নয়; এটি একটি সাংগঠনিক ধস। নেতৃত্ব ও কর্মীদের মধ্যে যে সংযোগ ছিল, তা ভেঙে গেছে।’
নির্বাচনি ফলাফলের মাত্রাই এই সাংগঠনিক দুর্বলতাকে প্রতিফলিত করছে। বিজেপির ভোটের হার ২০২১ সালের ৩৮ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে, অন্যদিকে তৃণমূলের ভোট কমে ৪৮ শতাংশ থেকে প্রায় ৪০.৯৪ শতাংশে নেমে এসেছে। আসনের হিসাবেও পরিবর্তনটি আরো স্পষ্ট— তৃণমূলের আসন সংখ্যা ২১৫ থেকে নেমে ৮০-তে দাঁড়িয়েছে, আর বিজেপি ৭৭ থেকে বেড়ে ২০৬টি আসন পেয়েছে। ফলে সাংগঠনিক শক্তিকে কার্যকরভাবে ভোটে রূপান্তর করে বিজেপি স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের পরিচয়ই ছিল তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন। দলের দ্বিতীয় সারির নেতৃত্বই ছিল এর মূল শক্তি। মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারী এবং পার্থ চ্যাটার্জির মতো নেতারা শুধু রাজনৈতিক মুখ ছিলেন না; তারা সংগঠনের ভিত গড়ে তুলেছিলেন, স্থানীয় রাজনীতি সামলাতেন এবং নির্বাচনি সাফল্য নিশ্চিত করতেন। কিন্তু এখন সেই স্তরটি অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত।
কিছু নেতা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দল ছেড়েছেন, কেউ বিতর্কে জড়িয়ে দুর্বল হয়েছেন, আবার অনেকের ভূমিকাই কমে গেছে— বিশেষ করে এমন এক কেন্দ্রীভূত কাঠামোয়, যা মূলত মমতা ব্যানার্জি ও অভিষেক ব্যানার্জিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক সঞ্জয় কুমার বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান যতটা তাদের নিজের বিস্তারের ফল, ততটাই তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকোচনের ফল। তৃণমূলের সংগঠনের একটি অংশ দলত্যাগের মাধ্যমে কার্যত বিজেপিতে স্থানান্তরিত হয়েছে।’
এই পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কেন এই পরাজয়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই পরাজয়ের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ কাজ করেছে—
১. স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কোন্দল ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব
২. দুর্নীতির অভিযোগে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
৩. বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংগঠন শক্তিশালী হওয়া
৪. গ্রামীণ ভোটব্যাংকে ভাঙন
৫. যুব ও প্রথমবারের ভোটারদের একাংশের বিরূপ মনোভাব
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে দলীয় নেতাদের জড়িত থাকার বিষয়টি ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সাংগঠনিক সংস্কারের রূপরেখা
তৃণমূল কংগ্রেস ইতোমধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে—
১. জেলা নেতৃত্বে নতুন ও অপেক্ষাকৃত তরুণ মুখ বসানো
২. পুরোনো ও বিতর্কিত নেতাদের প্রভাব কমানো
৩. বুথভিত্তিক সংগঠন পুনর্গঠন
৪. নারী ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো
৫. সোশ্যাল মিডিয়া ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে জোর
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করা হবে।
কেন্দ্র-রাজ্য রাজনীতির প্রভাব
তৃণমূলের এই পরিবর্তন শুধু দলীয় নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিরোধী জোট রাজনীতিতে মমতা ব্যানার্জি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে তার দলের দুর্বলতা বিরোধী রাজনীতির সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, বিজেপি এই ফলাফলকে নিজেদের সাংগঠনিক সাফল্য হিসেবে দেখছে এবং ভবিষ্যতে আরো বিস্তারের পরিকল্পনা করছে।
সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ?
তৃণমূল কংগ্রেসের সামনে এখন কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—
১. দলীয় ঐক্য ফিরিয়ে আনা
২. দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বেরিয়ে আসা
৩. তৃণমূল পর্যায়ে জনসমর্থন পুনরুদ্ধার
৪. বিরোধীদের মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল তৈরি
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংস্কার প্রক্রিয়া কতটা সফল হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বে যে দ্রুত পরিবর্তন আনছে, তা দলটির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এখন দেখার বিষয়, এই পুনর্গঠন কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং তা ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে।