শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
ছবি-সংগৃহীত
মার্কিন গোয়েন্দারা সতর্ক করে বলেছেন, ন্যাটো জোটের দৃঢ়তা পরীক্ষা করার জন্য আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এর কোনো সদস্য দেশে হামলা চালাতে পারে রাশিয়া।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন যে, চলতি শরৎকাল থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে যেকোনো সময় পূর্ব ইউরোপে সীমিত পরিসরে স্থল অনুপ্রবেশ বা সাইবার হামলার মাধ্যমে রাশিয়া উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।
মার্কিন গোয়েন্দাদের পূর্ববর্তী মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় ভ্লাদিমির পুতিন অন্য কোথাও হামলা চালাবেন না। তবে নতুন এই প্রতিবেদন তাদের সেই অবস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।
গত মাসে দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইউরোপীয় এবং মার্কিন গোয়েন্দারা পোল্যান্ডের মাটিতে সশস্ত্র উসকানি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা অথবা ইউক্রেনের ওপর দায় চাপাতে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা সাজানো হামলার বিষয়ে রাশিয়ার পরিকল্পনার আভাস পেয়েছে।
মস্কো ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে এবং যুদ্ধের পঞ্চম বার্ষিকীর আগে কিয়েভকে সমর্থন দেওয়া থেকে তাদের বিরত রাখার কৌশল হিসেবে এসব পরিকল্পনা করছে বলে মূল্যায়ন করা হয়েছিল।
গত সপ্তাহে পোল্যান্ডে একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়া এবং মঙ্গলবার জার্মানির লাইপজিগ/হ্যালে বিমানবন্দরে একটি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন পাওয়ার পর এমন সম্ভাব্য উসকানিমূলক হামলার খবর সামনে এল। ড্রোনটির লক্ষ্যবস্তু অস্ত্র বহনকারী একটি ইউক্রেনীয় জেট ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ন্যাটো জোটের পূর্ব দিকে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকির বিষয়ে কয়েক মাস ধরেই পোল্যান্ড এবং বাল্টিক দেশগুলোর নেতারা কথা বলে আসছেন।
বৃহস্পতিবার লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, ক্রেমলিন বাল্টিক দেশগুলোতে হামলা চালানোর জন্য ইউক্রেনে তৈরি ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে।
রবার্টাস কাউনাস বলেন, ইউরোপকে বিভক্ত করতে এবং ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন দুর্বল করার চেষ্টায় মস্কো এই ‘সাজানো’ হামলা চালাতে পারে।
বৃহস্পতিবার দিনের শেষের দিকে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে রাশিয়ার উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা কেবল ‘হিমশৈলের চূড়া’ (বিশাল বিপদের সামান্য অংশ) মাত্র।
স্ট্রিটিং গত মাসে প্লাইমাউথের কাছাকাছি ইংলিশ চ্যানেলে রুশ যুদ্ধজাহাজ ‘নিউস্ট্রাশিমি’-এর লাইভ ফায়ার বা তাজা গোলা বর্ষণ মহড়ার কথা উল্লেখ করছিলেন।
তিনি দ্য সান পত্রিকাকে বলেন, ‘চ্যানেলে গোলাগুলির মতো ঘটনাগুলো লোকদেখানো, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং উসকানি দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা। প্রতিদিন আমরা রাশিয়ার দিক থেকে যে ধরনের উসকানি দেখি, এর মাধ্যমে ব্রিটিশরা অন্তত তার একটি দৃশ্যমান রূপ দেখতে পাচ্ছে।’
মার্কিন গোয়েন্দারা পোল্যান্ড এবং বাল্টিক অঞ্চলের তিনটি দেশকে সতর্ক করে আসছে যে, ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পুতিন এখন ন্যাটো জোটকে লক্ষ্যবস্তু বানাতেও প্রস্তুত।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নে পরিবর্তন আসে, কারণ রুশ প্রেসিডেন্ট নিজেকে ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে আবিষ্কার করেন এবং কিয়েভ ও পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে জয় নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন।
সম্ভাব্য হুমকিগুলোর মধ্যে সাইবার হামলা, কোনো এলাকা দখলের জন্য পরিচয়হীন গোষ্ঠী পাঠানো থেকে শুরু করে জোটের পূর্ব দিকে সীমিত অনুপ্রবেশ পর্যন্ত থাকতে পারে। যদিও শেষেরটির সম্ভাবনা কম, তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকি বাড়ছে।
স্থলপথে হামলার বিষয়টি এর আগে খুবই অসম্ভাব্য বলে মনে করা হতো, কারণ এতে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই ধারায় বলা আছে, কোনো এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা।
দ্য টেলিগ্রাফকে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ন্যাটোর মাধ্যমে প্রচারিত সর্বশেষ গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে যে পুতিন এর পরিবর্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নাশকতা বা অন্যান্য হাইব্রিড (মিশ্র) কৌশল বেছে নিতে পারেন, কারণ সামরিকভাবে ন্যাটো জোটকে পরাজিত করা একটি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।
ন্যাটোর মুখপাত্র কর্নেল মার্টিন ও’ডোনেল বলেন, জোট ‘প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধ ও রক্ষা করতে প্রস্তুত।’ তিনি আরও যোগ করেন, জোট ‘সব সময় যেকোনো পরিস্থিতির কথা চিন্তায় রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে।’
মঙ্গলবার লাইপজিগ/হ্যালে বিমানবন্দরে একটি ইউক্রেনীয় কার্গো বিমানের পাশে বিস্ফোরকবোঝাই একটি ড্রোন পাওয়া যায়। এর উৎস অস্পষ্ট হলেও জার্মান রাজনীতিকরা মস্কোকেই দায়ী করেছেন।
মধ্যরাতের কিছুক্ষণ আগে আন্তোনভ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানের কাছাকাছি সেমটেক্স ডিভাইস বহনকারী ওই ড্রোনটি আবিষ্কৃত হওয়ার পর বার্লিন সন্ত্রাসবাদ বিরোধী তদন্ত শুরু করে। এই ঘটনার কারণে বিমানবন্দরটি সাময়িক বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।
পূর্ব জার্মানির এই বিমানবন্দরটি জার্মান সামরিক বাহিনী এবং ন্যাটো মিত্রদের সামরিক সরঞ্জাম পরিবহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং আন্তোনভ জেটের ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। ন্যাটো জানিয়েছে, তারা এই হামলার বিষয়ে অবগত।
ন্যাটোর বিরুদ্ধে যেকোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপের লক্ষ্য হবে জোটের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ানো এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ইউক্রেনের সহায়তা স্থগিত করতে বাধ্য করা।
ভিলনিয়াসের দিকে উড়ে আসা একটি আক্রমণকারী ড্রোনকে বাধা দিতে ন্যাটো যুদ্ধবিমান পাঠানো হলে, গত মে মাসে লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রী একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হন।
গত মাসে পোল্যান্ডের একটি গ্রামের কাছে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ার পর ন্যাটো রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি ‘বেপরোয়া’ হামলা চালানোর অভিযোগ এনেছে।
কেএইচ-১০১ ক্ষেপণাস্ত্র বলে ধারণা করা ওই প্রজেক্টাইলটি ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে টারনাওয়া-কোলোনিয়া গ্রামের কাছে আছড়ে পড়ে এবং সেখানে ১০ মিটার চওড়া একটি গর্তের সৃষ্টি করে।