শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২
তারেক রহমান নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন। ছবি: সংগৃহীত
প্রতিটি পরিবারের জন্য 'ফ্যামিলি কার্ড', 'ফ্যাসিস্ট আমলে' মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আশ্বাস এবং বিগত সময়ে নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফাকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
দেশে এ পর্যন্ত ১২টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তবে সব নির্বাচনে বিএনপি'র অংশগ্রহণ ছিল না। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দলের হাল ধরেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া। পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম সংসদ নির্বাচন – প্রতিটিতেই দলের নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া এবং তিনিই প্রতিটি নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন। এরপর শেখ হাসিনার অধীনে ২০১৮ সালের দশম নির্বাচন বয়কট করেছিলো বিএনপি। তাই, তখন নির্বাচনি ইশতেহারের কোনো প্রসঙ্গ ছিল না।
একাদশ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশ নিলেও সেই সময়ে খালেদা জিয়া কারাগারে ছিলেন। তাই, ২০১৮ সালের সেই নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার অধীনে আয়োজিত হয় বাংলাদেশে সর্বশেষ, অর্থাৎ দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু সেই নির্বাচনও বয়কট করেছিল বিএনপি। সেই হিসেবে, দীর্ঘ বিরতির পর এবার নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছে বিএনপি এবং এটাই তারেক রহমানের প্রথম নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা।
ইশতেহারকে পাঁচটি ভাগ, নয়টি অঙ্গীকার
বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছে। সেগুলো হলো– রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার; বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন; ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার; অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি।
রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারকে আবার পাঁচ ভাগে ভাগ করেছে বিএনপি। এর মাঝে আছে – গণতন্ত্র ও জাতিগঠন; মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান; সাংবিধানিক সংস্কার; সুশাসন এবং স্থানীয় সরকার।
বিএনপি মূলত বিগত সময়ে তাদের ঘোষিত ৩১ দফাকেই সামনে আনছে।
এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেছেন, ‘বিএনপি যখন ৩১ দফা দেয়, তখন জুলাই সনদের বিষয়টি তখন ছিল না। জাতি গঠন ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন জরুরি। জুলাই সনদের অনেককিছুর সাথে ৩১ দফার মিল আছে।’
রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের মাঝে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানসহ 'ফ্যাসিস্ট আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধের' সুবিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, এটিকে কীভাবে একটি পরিবারের বা দলের করার চেষ্টা করে হয়েছে। তাই নিরপেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংগ্রহ করা প্রয়োজন।’
এছাড়া, সাংবিধানিক সংস্কারের প্রথমেই থাকছে 'সর্ব শক্তিমান আল্লাহ'র প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' কথাটিকে সংবিধানের মূলনীতি করা।
তারেক রহমান বলেন, যে বিএনপি বাংলাদেশের সংবিধানে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' এবং 'সর্ব শক্তিমান আল্লাহ'র প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' – এই দু'টো বিষয় যুক্ত করেছিলো। কিন্তু আওয়ামী লীগ 'সর্ব শক্তিমান আল্লাহ'র প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' কথাটিকে সরিয়ে দেয়। তাই বিএনপি ক্ষমতায় এলে এটিকে পুনঃস্থাপন করতে চায়।
তিনি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা'র ওপরও বিশেষভাবে জোর দেন। তিনি জানান, স্থানীয় সরকারকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে দেশের অনেক সমস্যার সমাধান স্থানীয়ভাবে করা সম্ভব।
এছাড়া, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা; উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃজন; প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা; সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন; উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী; বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার; ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন; জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রদান; জুলাই হত্যার বিচার; গণঅভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষাসহ আরও অনেক বিষয় এতে উল্লেখ আছে।
চাকরি, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তাসহ গুরুত্ব পেয়েছে যেসব বিষয়
ইশতেহারের অন্যান্য ভাগে যা আছে, তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো – স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সাথে পাঁচ লাখ সরকারি শূন্য পদে কর্মচারি নিয়োগ; বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়ন করা, পেনশন ফান্ড গঠন ও বেকারভাতা চালু।
আইটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থার সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। নারী, পুরুষ ও প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন বেতন এবং সবেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি চালু করার পরিকল্পনা আছে তাদের।
দেশের প্রতিটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে 'ফ্যামিলি কার্ড' দেওয়া এবং নারীর নামে হবে এই কার্ড দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে বিএনপি।
এছাড়া, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খামারিদের জন্য 'কৃষক কার্ড' দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের কাজের সুরক্ষা এবং গণমাধ্যমের ওপর আগ্রাসন প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতিও আছে ইশতেহারে। গণমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে 'স্বাধীন রেগুলেটরি বডি' গঠন এবং ৩০ দিনের মধ্যে অনলাইন অভিযোগ নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে।
পাঁচ বছরে ৫০ কোটি গাছ রোপনের পরিকল্পনার কথা বলছে দলটি। এক্ষেত্রে তারা যে এলাকায় যেই গাছ ভালো জন্মায়, সেখানে তারা সেই গাছ রোপন করবে। যেমন, ঢাকার জন্য নিম গাছ।
কৃষকদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ করতে চায় তারা। পাশাপাশি, দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পাশাপাশি নদী খনন করে নৌ পথে চলাচলেও উন্নতি আনার কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে।
ব্যাংকিং খাত ও স্বশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে চায় বিএনপি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে অন্য দেশের সাথে বন্ধুত্ব করার কথা বলছে দলটি।
‘পদ্মা, তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানি বন্টন নিয়ে অসুবিধা আছে। যাদের সাথে অসুবিধা আছে, তাদের সাথে বসে এই সমস্যার সমাধান করতে চাই। যাতে আমার দেশের মানুষ পানির ন্যায্য হিস্যা পায়,’ বলেন তারেক রহমান।
পরিবেশ রক্ষায় থ্রি আর (রিসাইকেল, রিডিউস, রিইউজ) পলিসি বাস্তবায়নের কথাও বলেন তারেক রহমান।

বিএনপি'র প্রধান নয়টি প্রতিশ্রুতি
বিএনপির ইশতেহারে যে নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো—
১. প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে 'ফ্যামিলি কার্ড' চালু করে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থ সেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।
২. কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে 'কৃষক কার্ড'-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষিখাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন।
৩. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
৪. আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও 'মিড-ডে মিল' চালু করা হবে।
৫. তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণসহ মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
৬. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
৭. পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যামে ১০ হাজার কিলোমিটার নদী–খালখনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।
৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিষ্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন, ও 'মেড ইন বাংলাদেশ' পণ্যের রফতানি সম্প্রসারণ করা হবে।
বিএনপি বলছে, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা।
‘বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা— এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে’- বলা হয়েছে ইশতেহারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)