মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬, ১০ চৈত্র ১৪৩২
ছবি : সংগৃহীত
বাঙালির জীবনে পার্বণের শেষ নেই। পার্বণের সবই, কোনো না কোনোভাবে উৎসবের সঙ্গে, দলবদ্ধতায় যাপিত যৌথ আনন্দের সঙ্গে জড়িত, যেখানে মানুষই মুখ্য। পার্বণের নানা উপচার আসলে মনুষ্যমুখী আর প্রকৃতি-বিজড়িত। আর এইসব উৎসবকে ঋদ্ধ ও বর্ণময় করতে আমাদের নতুন নতুন উপাদান দরকার। সজ্জিত করা, সজ্জিত হওয়া উৎসবেরই অংশ। নানামুখী মানবিক প্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আমাদের সাহিত্য।
স্কুল-কলেজের একটা পর্যায় থেকেই আমরা চোখে দেখতে আর হাতে পেতে শুরু করেছিলাম ওপার বাংলা থেকে ভেসে আসা সব শারদীয় সংখ্যার সম্ভার। সেখানে দাপট ছিল মূলত সিনেপত্রিকাগুলোর। অনেক বিখ্যাত লেখকের গল্প-উপন্যাসের মুখোমুখি আমরা হয়েছিলাম সেইসব বিশেষ সংখ্যার পাতায়।
বিমল মিত্র, শংকর, সমরেশ বসুকেও পেয়েছিলাম ওসব পত্রিকায়। সেইসব সিনেপত্রিকার দাপট কমলো দেশ, আনন্দবাজার, প্রতিক্ষণ, আজকাল আর বর্তমান জাতীয়, দৈনিকসমূহের পরিকল্পনায়, দক্ষতায়, বিখ্যাত সব লেখকের সমারোহে, মুদ্রণের অসামান্য পারিপাট্যে, প্রচারের দুর্দান্ত অভিনবত্বে। এখন সেসব পত্রিকার ধারাবাহিকতা যদিও বজায় আছে, আমাদের বয়সীদের আর তেমন টান আছে বলে মনে হয় না।
এর আরেকটি কারণ আমার মনে হয়, স্বাধীন বাংলাদেশের সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যায় থেকে আমাদের প্রধান উৎসবের একটি, ঈদকে কেন্দ্র করে ঈদসংখ্যা বেরোনো শুরু হলে, সেসবের প্রতিই আমাদের আগ্রহের একটা বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হতে থাকলো।
এক্ষেত্রেও আমাদের দেশের বিখ্যাত সিনেপত্রিকা দুটো—চিত্রালী ও সিনেমা, বেশকিছু বিখ্যাত উপন্যাস ছাপে। পাশাপাশি বিচিত্রা, তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে। পরে আরও বেশ ক’টি পত্রিকার ঈদসংখ্যাও পাশাপাশি বেরোতে শুরু করে।
আমাদের সেরা লেখকদের অনেকেই তাদের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে, নতুন স্বাধীন দেশের অশ্রু-রক্তপাতময় অজস্র উত্থানপতনকে, তাদের নানা রচনার শরীরে চিত্রিত করেন। স্বজনহারানো রোদনের পাশাপাশি, আমাদের সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ, গুরুগম্ভীর বেদনাভারের পাশাপাশি চলমান অস্থিরতার, সংকটের নানামুখী ছবিকেও তুলে ধরেন।
মুক্তিযুদ্ধ এক অন্যতম অবলম্বন হয়ে ওঠে সেখানে। কিন্তু, চার দশক ধরে এ কথাটি শুনে অভ্যস্ত হতে বাধ্য হয়েছি যে, সত্যিকার অর্থে তেমন কোনো বড় ক্যানভাসের আলোয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সাহিত্যের কোনো শাখায় প্রতিবিম্বিত হয়নি। যা হয়েছে তার সবই নাকি খণ্ডিত। আবার কেউ কেউ এমন মূল্যবান মন্তব্যও দাখিল করেছেন যে, আরও সময় দিতে হবে লেখক-শিল্পীদের, যে অনাবিল দূরত্ব থেকে দাঁড়িয়ে তারা সঠিক আর সত্যিকার ব্যাখ্যা তৈরি করবেন, শিল্পভাষায়।
এইসব আলোচনা-সমালোচনার দ্বিধাকে পাশ কাটিয়ে আমাদের লেখকদের বড় গোষ্ঠীর অংশটা সৃজ্যমান ছিলেন, এখনো আছেন। এটাই আমাদের জন্য বিরাট ব্যাপার।
আগে একটা ঈদকে কেন্দ্র করেই বিশেষ সংখ্যার দেখা পেতাম আমরা। শুধু ঈদসংখ্যার জন্যেই শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটা বাজেট থাকতো। ঈদের ছুটির দিনগুলোয় রঙিন মূর্ছনা নিয়ে আসতো এসব বিশেষ সংখ্যার স্ফীত চেহারার সম্ভার। কিন্তু শারদীয় সংখ্যাগুলোর মতোই এখনকার ঈদসংখ্যাগুলোও আমাদের কাছে অনেকটাই আবেদন হারানোর পথে।
অজস্র লেখক, অজস্র পাঠক, আর অজস্র পত্রিকা। হকারদের সামনে ছড়ানো শত পত্রিকার ভিড়ের ভেতর বোঝা মুশকিল, কোন পত্রিকাটি আমার সংগ্রহে রাখা উচিত। লেখার মান, লেখকের তাড়াহুড়ো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বহু লেখক-পাঠক। শুনি সেসব। বোঝার চেষ্টা করি।
প্রবীণ লেখকদের একটা বিশেষ প্রবণতা হলো, ব্যতিক্রম বাদে, নতুনদের লেখা কিছুই হচ্ছে না বলে অভিযোগ তোলা। ওদের পড়াশোনার মান নিয়ে প্রশ্ন করা। কে কী পড়ে না পড়ে, সেটা তো অন্যের পক্ষে জানা কঠিন। প্রতিটি বৃক্ষ-শিশুর বেড়ে ওঠা তার নিজেরই ধরনে।
শিল্পীদের ক্ষেত্রেও এটা আরও বেশি প্রযোজ্য। একথা বলা বোধ করি অন্যায্য হবে না যে, আগের দিনের ঈদসংখ্যাগুলোর লেখা ও লেখকের মানের তুলনায় হয়তো আজকের মুদ্রণ-শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ও সৌন্দর্য-সৌকর্য বৃদ্ধির এই দিনে সংখ্যার দিক থেকে অনেক এগুলেও মান কি ততটা বেড়েছে?
বাংলা ভাষার বিখ্যাত কবি রণজিৎ দাশ তার এক লেখায় সেখানকার বিরাট এক বাংলা পত্রিকার বিরুদ্ধেই শিরোনাম দাগিয়ে দিয়েছিলেন ‘সুমুদ্রিত অবক্ষয়’ শব্দযুগল ব্যবহার করে। অনেক ঈদসংখ্যার সূচিপত্র দেখলে আমার মাথার ভেতর এই শব্দগুচ্ছ কাজ করে।
আমরা তো সবার সব লেখা পড়ে উঠতে সক্ষম হই না। তাই, যেকোনো বিবেচনার অন্তিমে পৌঁছানোর জন্য পাঠটা বড় জরুরি। একটা সময়, ঈদসংখ্যার রিভিউ করার জন্য দুই সিনিয়রের সঙ্গে একটা চ্যানেলে বসেছিলাম। কিছু অর্বাচীন-মার্কা দুঃসাহসী মন্তব্যও করেছিলাম। সেইসব দিনে চ্যানেল কম ছিল। আজকের দিনে অনেক চ্যানেল। কিন্তু সমালোচনার অনুষ্ঠান নেই।
ঈদসংখ্যাগুলো নিয়ে প্রতিটি চ্যানেলে একটা-দু’টো অনুষ্ঠান হলে লোক-পাঠকের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। এর বাণিজ্যিক মূল্যকেও হেলা করার কিছু নেই। আলোচনা-সমালোচনা হলে লেখক-পাঠক উপকৃত হন। সদর্থক সমালোচনা থেকে দূরে বলেই আমাদের সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি, রাজনৈতিক লোকজন, সমাজ-মানসের সামগ্রিক বিকাশ অবরুদ্ধ হয়ে আছে নিথর নদীর মতো।
আসলে কি, লেখকের লেখা, ঈদের আনন্দ, পত্রিকার উদ্যোগ—এসব আলাদা কিছু? পরস্পর বিযুক্ত কোনো কিছু? একটি চলমান সমাজের বহু বৃত্তের পারস্পরিক বৃত্তগ্রন্থনের (ইন্টারসেপশন) ভেতর দিয়ে আমরা চলতে থাকি। সব বৃত্ত সমান ঋদ্ধ হলে ফল ভালো আসবে। আমরা সামনে এগুবো। না হলে পেছানোই অন্তিম নিয়তি।
পার্বণের জন্যে, উৎসবের জন্যে মানুষগুলোর দরকার মানসিক স্থিতিশীলতা আর অর্থনৈতিক সাধারণ সামর্থ্যের নিশ্চয়তা। আর মৌলিক চাহিদাগুলোর সঠিক পরিপূরণ সবার আগে। তারপরও উৎসবের আমেজের আগাম সুরভি পেলেই আমাদের গণি মিয়া হওয়ার লোভ জাগে।
বাস্তব জীবনের নানা বন্ধুরতার ভেতর এইটুকু অবকাশ তো সব মানুষেরই প্রয়োজন। বছরের বাকি সময়টুকুর, মানুষগুলোর অক্লান্ত শ্রমজীবীতার ক্লান্তি কাটানোর এই অনন্য সুযোগটুকু কেইবা ছাড়তে চায়? আর তাই উৎসবের আয়োজন, আনন্দের ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া, এর মাঝেই আসে আনন্দ ম্লান হওয়ার দুঃসংবাদ। সড়ক, রেল, লঞ্চ দুর্ঘটনার খবর। দেশের কোনো কোনো অংশে নিভে যায় আনন্দ-বাতি।
অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ের এই স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা ট্র্যাজেডিবিহীন ক’টা ঈদ করতে পেরেছি? তবুও সব পেরিয়ে উৎসবের হাওয়া লাগে। লেখকেরা এই সমাজেরই অংশ। এই সমাজের সব সীমাবদ্ধতার বৃত্তের ভেতর তাদের অবস্থান। সেইসব ‘সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে’ যতটা ফলানো সম্ভব, সেটুকুই তারা ফলাতে সক্ষম হবেন।
অতিমানবিক হারকিউলিস হয়ে ওঠার সুযোগ এখানে যারপরনাই অনুপস্থিত। আর তাই আমরা যখন লেখকের কাছে বড় লেখা চাই, সেই বড় লেখার ধারণাটিইবা কেমন বড়?
আরেকটা দিক হচ্ছে চার-পাঁচ-সাতটা ঈদ সংখ্যার লেখক হওয়া। কবিতার পক্ষে সম্ভব হলেও যারা গদ্য, উপন্যাস রচনা করছেন, তাদের পক্ষে মুদ্রণ-খাদকের এত খাদ্য চাহিদা মেটানো সম্ভব? তিনি কি, তারা কি তার/তাদের সব রচনার ক্ষেত্রে সমান মনোযোগ দিতে সক্ষম? মনুষ্য-অসাধ্য নিঃসন্দেহে।
মানুষের জন্য লেখা, মানুষকে নিয়ে লেখা, মানুষের লেখা—এই তিন বাহু নিয়ে যে আদর্শ ত্রিভুজের কথা আমরা ভেবে এসেছি এতকাল, তার সঙ্গে যে এখন আরও বহু অনুপান যুক্ত করার উসকানি দিচ্ছেন বাইরের লেখক সমালোচকেরা। কত ইজম যে যুক্ত হচ্ছে, ব্যাখ্যা কত রকমের কথা যে শোনা যাচ্ছে, সেগুলো আত্মীকরণের চ্যালেঞ্জও তো আমাদের লেখকদের সামনে।
সব মেনে নেওয়ার পর আসল প্রশ্ন—কারা পড়বেন এসব লেখা? পাঠ-প্রস্তুতির বিষয়ে আমাদের অনুশীলন কতটা সাধিত হয়েছে? গোড়াতে গেলেই আমরা মুষড়ে পড়বো। আমাদের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া, আন্তর্কাঠামোর বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া বাকি সবটুকুই কেবল হতাশার জন্ম দেবে।
তুষার দাশ : কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)