রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২
ছবি : সংগৃহীত
ঈদে সড়ক, রেল ও নৌপথে যে ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলো ঘটল, সেগুলো শুধু ‘দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটিয়ে গেলে ভুল হবে। এগুলো আসলে সিস্টেম ব্যর্থতার লক্ষণ।
১৭ থেকে ২৬ মার্চের মধ্যে সড়ক, রেলে ও নৌপথেও ধারাবাহিকভাবে বড় প্রাণহানি ঘটেছে। ঈদযাত্রা এখন বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা সক্ষমতার একটি লিটমাস টেস্ট। এই ঈদে তিনটি ঘটনা বিশেষভাবে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে কোথায় সমস্যা।
প্রথমত, কুমিল্লার পাদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হন।
দ্বিতীয়ত, সদরঘাটে লঞ্চের চাপে ছোট নৌযান পিষ্ট হয়ে প্রাণহানি ঘটে।
তৃতীয়ত, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মায় পড়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়।
তিনটি ঘটনাই আলাদা মনে হলেও, প্রকৌশল ও অপারেশনাল দৃষ্টিকোণ থেকে এদের মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র আছে, আর সেটা হলো মানুষ, যান, অবকাঠামো যেখানে একসাথে মিশেছে সেখানেই ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হয়েছে
তাই একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরে ফিরে আসে তা হলো, কেন প্রতিবছর এত প্রস্তুতি থাকার পরেও আমরা প্রাণহানি আটকাতে পারছি না?
সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ হলো স্পিড-ম্যানেজমেন্টের ব্যর্থতা। ঈদের আগে ও পরে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যানজট তৈরি হলে অনেক চালক রাস্তা ফাঁকা পেয়ে ‘টাইম রিকভারি’ করতে গিয়ে অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং করে এবং রিস্ক নেয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় মিশ্র ট্রাফিক যেখানে একই রাস্তায় বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, সিএনজি, ইজিবাইক, পথচারী সবাই একসাথে চলছে। এ অবস্থায় একটি ভুলই একাধিক মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়াও বাসের অতিরিক্ত ভাড়া, টিকেট না পাওয়া, ভোগান্তি ইত্যাদি কারণে অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে দূরের যাত্রায় মোটরসাইকেল ব্যাবহার করে।
একই রাস্তায় ভারী যান এবং দুই চাকার মোটরসাইকেল এর মিশ্রণ, যাদের মধ্যে গতি ও কাঠামোগত ভিন্নতা আছে, ভিন্নতা থাকা খুব বিপদজনক। তার প্রমাণ ২০২৬ সালেও ঈদের সময় মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা বাড়ার প্রবণতা আগের বছরগুলোর মতো উদ্বেগজনক।
আমাদের পরিবহন ব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে, তা হলো যার একটি বাস/লঞ্চ তিনিও মালিক আর যার একাধিক বাস/লঞ্চ তিনিও মালিক। এখানে সবাই চায় লাভ করতে আর এতে তৈরি হয় অনিয়ন্ত্রিত যাত্রী-দখল প্রতিযোগিতা।
এই প্রতিযোগিতা সড়কে গতি বাড়ায়, টার্মিনালে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে এবং ফেরিঘাটে অপারেশনাল ঝুঁকি বাড়ায়। তাই আগামী ঈদের আগে অন্তত যে রুটে যাত্রী চাপ বেশি সেই করিডোরগুলোয় বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং নৌ রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি সিস্টেম চালুর বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত।
অর্থাৎ, নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট সংখ্যক অনুমোদিত অপারেটর, নির্দিষ্ট ট্রিপ-স্লট, একীভূত টিকিটিং, সময়ভিত্তিক পরিচালনা ইত্যাদি চালু করতে হবে। এতে ‘যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা’ কমবে, বাসস্ট্যান্ড, নৌ-ঘাট, হাইওয়ে সবখানেই অনিরাপদ চালনা কমবে। নিরাপত্তার দৃষ্টিতে এটি শুধু বাণিজ্যিক সংস্কার নয়; এটি দুর্ঘটনা ঠেকানোর একটি সাসটেইনেবল কৌশল।
রেলপথের ক্ষেত্রে মূল দুর্বলতা হলো রেলক্রসিং নিরাপত্তা। রেলক্রসিং এমন একটি জায়গা যেখানে ভুলের সুযোগ শূন্য হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে আমরা এখনো মানবনির্ভর ব্যবস্থা, দুর্বল তদারকি ও মান্ধাতা আমলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে আটকে আছি। অন্যদিকে নৌ-পথেও একই ধরনের সমস্যা। আমাদের টার্মিনালগুলোয় ঈদের সময় কেবল ‘অতিরিক্ত যাত্রী’ মূল সমস্যা নয়, বরং টার্মিনালের ডিজাইন ও অপারেশনাল নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল। নৌ-টার্মিনালে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, যাত্রী আলাদা রাখা, ছোট নৌযান নিষিদ্ধ এলাকা এবং ওঠানামার শৃঙ্খলা-এসব কাগজে থাকলেও মাঠে সবসময় কার্যকর হয় না।
সবচেয়ে আলোচনায় থাকা দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটের বাস-নদীতে পড়ার ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে আর তা হলো ভারী যানবাহনের নিরাপদ থামার ব্যবস্থা। বড় বাসে সাধারণত এয়ার ব্রেক সিস্টেম থাকে। যদি বাতাসের চাপ কমে যায় বা লিক হয়, তাহলে ব্রেক কাজ নাও করতে পারে।
যদি গাড়ি ঢালু র্যাম্পে থাকে, হুইল লক ব্যবহার না করা হয়, চালকের পদ্ধতিগত কোনো ভুল হয়, ব্রেক সিস্টেম ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা না থাকে এবং ফেরিতে নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকে তাহলে কয়েক সেকেন্ডেই বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।
এ অবস্থায় ওই বাসকে থামানোর জন্য কোনো ইমারজেন্সি ব্রেক সিস্টেম নেই আর আমাদের প্রায় সব ফেরি ঘাটের রাস্তা থাকে ঢালু ও ভাঙাচোরা যা ঝুঁকি বাড়ায়। তাই, এটি শুধু ‘ড্রাইভারের ভুল’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই; এটি যানবাহনের ইঞ্জিনিয়ারিং, টার্মিনাল ডিজাইন, রাস্তার অবস্থা এবং অপারেশনাল প্রোটকলের অভাবসহ সব বিষয়কে সামনে আনে।
আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো টোল প্লাজা। ঈদের সময়ে টোলপ্লাজায় থামা, লেন বদল, হঠাৎ ব্রেক, এসব থেকে বহু দুর্ঘটনা ঘটে। তাই বড় সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ের সব টোল প্লাজায় শতভাগ ইলেকট্রনিক টোল আদায় ব্যবস্থা চালু করা এখন নিরাপত্তা-অবকাঠামোর অংশ।
এতে গাড়ি না থেমেই টোল দেওয়া যাবে, ফলে শুধু যানজটই কমবে না, বরং অপ্রয়োজনীয় থামা-চলা ও সংঘর্ষ ঠেকানো সম্ভব। এছাড়া ঈদের পর ফাঁকা রাস্তায় আরেকটি নীরব ঝুঁকি তৈরি হয়, আর তা হলো ফাঁকা রাস্তায় অতিরিক্ত গতি।
যাত্রীর চাপ কমে গেলে, সড়ক তুলনামূলক ফাঁকা এবং নজরদারির অভাবে অনেক চালক স্পিডিং করে। তাই ঈদের পর অন্তত ৩ দিন স্পিড ক্যামেরার সাহায্যে বিশেষ গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা উচিত। বিশেষ করে ফাঁকা রাস্তা মানেই বেশি গতি এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে ঈদ-পরবর্তী প্রাণহানি কমানো যাবে না।
তাহলে প্রতিকার কী?
প্রথমত, ঈদযাত্রার নিরাপত্তা পরিকল্পনা হতে হবে ঝুঁকি-ভিত্তিক। সব রুট, নৌ টার্মিনাল, রেলক্রসিং বা মহাসড়কের ঝুঁকি এক নয়। তাই সরকার, বিআরটিএ, বিআইডব্লিউটিএ, রেলওয়ে ও হাইওয়ে পুলিশকে আগে থেকেই উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ স্থান যেমন টার্মিনাল, ফেরিঘাটের ঢাল, অরক্ষিত রেলক্রসিং, দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁক, যানজট প্রবণ এলাকা ও টোল প্লাজা চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারির ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বসাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যানবাহনের ফিটনেস ও যানবাহন পরিচালনা মনিটরিং করা দরকার। ঈদের আগে সব দূরপাল্লার বাসের ব্রেক, টায়ার, স্টিয়ারিং ও পার্কিং ব্রেক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফেরিঘাটে ভারী যান ওঠানামার সময় ঢালু রাস্তায় চাকা আটকানোর ব্যবস্থা রাখা ও ভলান্টিয়ার দ্বারা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রেলক্রসিংয়ে শুধু গেটম্যানের ওপর নির্ভর না করে স্বয়ংক্রিয় গেট, স্বয়ংক্রিয় সতর্কবাতি-সাইরেন ও সিসিটিভি চালু করা জরুরি।
তৃতীয়ত, এত কিছুর পরেও দুর্ঘটনা ঘটে গেলে দ্রুত উদ্ধার করার জন্য ব্যবস্থাপনা প্রস্তুত রাখতে হবে। বড় দুর্ঘটনার পর প্রথম ৩০ মিনিটই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই মহাসড়ক, বড় রেলক্রসিং, ফেরিঘাট ও নদীপথে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, টো-যান, কাটার সরঞ্জাম ও ডুবুরি প্রস্তুত রাখতে হবে।
উদ্ধার কার্যক্রম যাতে সমন্বিত হয় সেজন্য একটি দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থাকতে হবে, যেখানে কে উদ্ধার করবে, কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করবে, কে আহতদের হাসপাতালে পাঠাবে, কোন-কোন হাসপাতালে কী সেবা থাকে এসব আগেই নির্ধারিত থাকতে হবে।
ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা অপ্রত্যাশিত নয় বরং অনুমিত তাই ডেটাভিত্তিক আগাম পরিকল্পনা করা দরকার। দুর্ঘটনার ধরন, যানবাহনের ধরন, কোন স্থানে বেশি দুর্ঘটনা হয়, কোন সময় ঝুঁকি বাড়ে, চালকের ক্লান্তি ও টার্মিনালের ভিড় এসব আগে থেকে বিশ্লেষণ করলে স্বল্প লজিস্টিকস দিয়েও একটি ভালো প্রস্তুতির মাধ্যমে অনেক প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব।
সবশেষে, দুর্ঘটনা শুধু পরিবহন সমস্যা নয়; এটি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার সমস্যা। তাই আগামী ঈদে প্রাণহানি কমাতে হলে নিরাপদ ডিজাইন, প্রযুক্তি ও নিরবচ্ছিন্ন মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ইমারজেন্সি ব্যবস্থা এই চারটিকেই সমন্বিত অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)