বৃহঃস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩


দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তায় সমন্বিত উদ্যোগ যখন সময়ের দাবি

Saima

প্রকাশিত:২৩ জুলাই ২০২৬, ১৭:২৫

ছবি ‍: সংগৃহীত

ছবি ‍: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম জনবহুল অঞ্চল। এই অঞ্চলের প্রায় দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষের খাদ্য, পুষ্টি ও জীবিকার সঙ্গে কৃষি সরাসরি সম্পর্কিত। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস, মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, পানির সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা এবং বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা, সব মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা আজ একটি জটিল আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা বলতে কেবল খাদ্যের প্রাপ্যতাই বোঝায় না; বরং নিরাপদ, পুষ্টিকর, সাশ্রয়ী ও মানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করা এর মূল উদ্দেশ্য। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং সঠিক কৃষি ব্যবস্থাপনার অভাবে খাদ্যের নিরাপত্তা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

এ অবস্থায় উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করা এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য। জমি প্রস্তুতকরণ, মানসম্মত বীজ নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা, সেচ, ফসল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ, প্রতিটি ধাপে বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা অনুসরণ করলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ খরা, আকস্মিক বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে জলবায়ু সহনশীল উন্নত জাত উদ্ভাবন, গবেষণা এবং দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি বিনিময় এখন অত্যন্ত জরুরি। একটি দেশে উদ্ভাবিত সফল প্রযুক্তি বা জাত দ্রুত অন্য দেশে সম্প্রসারণ করা গেলে পুরো অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাই অধিক স্থিতিশীল হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার কৃষির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো মাটির স্বাস্থ্য। বছরের পর বছর অনিয়ন্ত্রিত সার ব্যবহারের ফলে অনেক অঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থ কমে যাচ্ছে, পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। তাই নিয়মিত মাটি পরীক্ষা, মাটির স্বাস্থ্যভিত্তিক সার সুপারিশ, জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। মাটির প্রকৃত অবস্থা জেনে সার প্রয়োগ করলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, ফলন বাড়বে এবং পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।

একইভাবে পানি ব্যবস্থাপনাও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উপাদান। দক্ষিণ এশিয়ার বহু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। অন্যদিকে কোথাও আবার অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই আধুনিক সেচ প্রযুক্তি, পানি সাশ্রয়ী কৃষি ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা সহজ হবে।

নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের অন্যতম দাবি। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা অনুমোদনহীন কীটনাশক ব্যবহার করেন। ফলে খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থেকে যায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, জৈব ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে বড় অগ্রগতি অর্জন সম্ভব।

খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ান ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করাও অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে উৎপাদন ও ভোক্তার মধ্যে দীর্ঘ বিপণন ব্যবস্থার কারণে কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না, আবার ভোক্তাকেও বেশি দাম দিতে হয়। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কোল্ড চেইন, মানসম্মত প্যাকেজিং, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, ই-কমার্স এবং সীমান্ত বাণিজ্য সহজ করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে।

মার্কেট প্রাইস বা বাজারমূল্যের স্থিতিশীলতাও খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কৃষক যদি উৎপাদনের সময় ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে ভবিষ্যতে উৎপাদনে আগ্রহ হারাবেন। আবার অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তার খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। তাই বাজার তথ্যের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, আগাম মূল্য পূর্বাভাস, কৃষিপণ্যের চুক্তিভিত্তিক বিপণন এবং আঞ্চলিক বাজার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আজকের বিশ্বে কৃষি আর কেবল ঐতিহ্যগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, রিমোট সেন্সিং, স্যাটেলাইট তথ্য, ড্রোন প্রযুক্তি এবং বিগ ডেটা কৃষিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।

মাটির স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ, রোগ-পোকার আগাম শনাক্তকরণ, আবহাওয়া পূর্বাভাস, সুনির্দিষ্ট সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও নিরাপদ করে তুলতে পারে।

সার্কভুক্ত দেশগুলোর উচিত এসব প্রযুক্তির যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং ব্যবহার সম্প্রসারণে একটি আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরাই দক্ষিণ এশিয়ার কৃষির প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বীমা, আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং ডিজিটাল কৃষি সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে। নারী ও তরুণদের কৃষিতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্য নিরাপত্তা কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; এটি একটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়। রোগবালাই, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য সংকট কিংবা বাজারের অস্থিরতা, এসব সীমান্ত মানে না। তাই গবেষণা, প্রযুক্তি, বীজ, তথ্য, বাজার এবং নীতিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। একটি শক্তিশালী দক্ষিণ এশীয় কৃষি সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে পুরো অঞ্চলই এর সুফল ভোগ করবে।

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, টেকসই কৃষি, জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, সুষ্ঠু মূল্য শৃঙ্খল এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সমন্বিত বিকাশই পারে দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি টেকসই, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সহযোগিতামূলক কৃষি ব্যবস্থার ওপর। এখন সময় প্রতিযোগিতার নয়, অংশীদারিত্বের; বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের নয়, সমন্বিত আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনার।

কারণ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হলে কেবল ক্ষুধা দূর হবে না, বরং স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিও আরও সুদৃঢ় হবে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

সমীরণ বিশ্বাস : কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৩:৫৮ - ৫:১৮ ভোর
যোহর ১২:০৫ - ৪:৩৪ দুপুর
আছর ৪:৪৪ - ৬:৪১ বিকেল
মাগরিব ৬:৪৬ - ৮:০৬ সন্ধ্যা
এশা ৮:১১ - ৩:৫৩ রাত

বৃহঃস্পতিবার ২৩ জুলাই ২০২৬