সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩
প্রতীকী ছবি
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ‘এল নিনোর’ নতুন একটি চক্র শুরু হতে যাচ্ছে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে তীব্র খরা, ফসলের ক্ষতি এবং চারণভূমি শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে বিশ্বের ২২টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের প্রায় ৮৮ লাখ (৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন) মানুষকে রক্ষা করতে ২০ কোটি ২০ লাখ ডলারের একটি যৌথ আগাম তহবিল বা তহবিলের আবেদন জরুরি ভিত্তিতে চালু করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। প্রশ্ন উঠেছে, কোন কোন দেশ এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং কৃষিখাতেই বা এর প্রভাব কতটা পড়বে?
এদিকে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস দিয়েছে, এবারের এল নিনো চক্রটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে। এই সতর্কবার্তার পর, বিশ্বের কোন কোন অঞ্চলে খরা ফসলের জমি ও চারণভূমিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তার একটি সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত মানচিত্র প্রকাশ করেছে এফএও।
এফএও’র এগ্রিকালচারাল স্ট্রেস ইনডেক্স সিস্টেম (এএসআইএস) থেকে নেওয়া গত ৪১ বছরের স্যাটেলাইট বা উপগ্রহের ঐতিহাসিক ছবি বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অতীতে শক্তিশালী ও তীব্র এল নিনো সাউদার্ন অসিলেশন (এনসো) আবহাওয়া চক্রের কারণে ঠিক কোন কোন অঞ্চলে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা হয়েছিল, তা চিহ্নিত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের এই যৌথ আগাম পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো—খরা, বন্যা কিংবা ঝড় মানবিক সংকটে রূপ নেওয়ার আগেই মাঠপর্যায়ে দ্রুত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা জোরদার করা। এর আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের কৃষক ও পশুপালকদের সরাসরি সহায়তা প্রদান, আগাম নগদ অর্থ সাহায্য পৌঁছানো এবং দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হবে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চল
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এল নিনোর কারণে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য আমেরিকা খরার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
চিহ্নিত এই অঞ্চলগুলোর কিছু কৃষি ও চারণভূমিতে আগামী মাসগুলোতে খরার আশঙ্কা ৫০ শতাংশেরও বেশি। এর আগে ২০১৫-১৬ এবং ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো চক্রের সময়েও এই অঞ্চলগুলোর অনেকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। সে সময় ব্যাপক ফসলহানি, গবাদিপশুর মৃত্যু, পারিবারিক ঋণের বোঝা বৃদ্ধি এবং দলে দলে মানুষের স্থানান্তরের মতো ঘটনা ঘটেছিল। কেবল ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর আঘাতেই ৬ কোটিরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা সামাল দিতে ২৩টি দেশে প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের মানবিক সহায়তার আবেদন করতে হয়েছিল।
এফএও-র প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক কর্মকর্তা হোর্হে আলভার-বেলত্রান বলেন, এবারের এল নিনো আগেরগুলোর মতো নয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা এখন অনেক বেশি। এর ওপর বিভিন্ন দেশে সংঘাত ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে নতুন এই আবহাওয়া চক্রটি এমন সব অঞ্চলে সবচেয়ে মারাত্মক আঘাত হানবে, যেগুলো এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ এবং যাদের এই ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা খুবই সীমিত।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে দক্ষিণ আফ্রিকা
আশঙ্কা করা হচ্ছে, কৃষিখাতে খরার এই ক্ষতিকর প্রভাবের ৮০ শতাংশেরও বেশি পড়বে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ওপর। এসব দেশের ফসল উৎপাদন পুরোপুরি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল এবং গবাদিপশুই সিংহভাগ পরিবারের একমাত্র বড় সম্পদ।
এফএও’র তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকায় সাম্প্রতিক এল নিনো চক্রের কারণে গত এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা দেখা দিয়েছিল। এর ফলে ওই অঞ্চলের প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ মানুষের জরুরি সহায়তার প্রয়োজন হয় এবং ৮১ লাখেরও বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েন। এফএও-র পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এবারও নামিবিয়া ও বতসোয়ানার একটি বড় অংশসহ অ্যাঙ্গোলা, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মোজাম্বিক ও মাদাগাস্কারের কিছু অংশে কৃষিভিত্তিক খরা হওয়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশেরও বেশি।
এফএও-র কর্মকর্তা আলভার-বেলত্রান বলেন, একজন কৃষক প্রথমে তার ফসল হারাতে পারেন, এরপর তার গবাদিপশু এবং এর হাত ধরে একসময় তার পুরো জীবিকাই শেষ হয়ে যেতে পারে। একের পর এক সংকটের যে ধারাবাহিক প্রভাব আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি, তা মোকাবিলায় এখনই আগাম পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সাহেল অঞ্চলে টানা পাঁচ বছর ধরে খাদ্য সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এর ওপর সেখানে চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন এবং ঝুঁকিতে থাকা সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এফএও-র মানচিত্রে দেখা গেছে, সেনেগাল ও মৌরিতানিয়ার দক্ষিণাঞ্চল থেকে শুরু করে কোত দিভোয়ার (আইভরি কোস্ট), ঘানা, টোগো, বেনিন ও নাইজেরিয়া এবং পূর্বদিকের ইথিওপিয়া ও সুদান পর্যন্ত এক বিশাল এলাকা জুড়ে এই কৃষিভিত্তিক খরার বিস্তৃতি ঘটতে পারে।
চরম ঝুঁকিতে মধ্য আমেরিকা ও এশিয়া
মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে খরার ঝুঁকি খুব দ্রুতই তীব্র দুর্ভিক্ষে রূপ নিতে পারে। এর আগে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর প্রভাবে মধ্য আমেরিকার ‘ড্রাই করিডোর’ বা শুষ্ক অঞ্চলে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছিলেন। অন্যদিকে হাইতিতে সে সময় ফসলের উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ধসে পড়েছিল, যার ফলে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেখানে খাদ্য সংকট দ্বিগুণ আকার ধারণ করে। এফএও জানিয়েছে, বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী এবার এই অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হওয়ার আশঙ্কা ৭০ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃষিভিত্তিক খরার ঝুঁকিতে রয়েছে ড্রাই করিডোর, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, ডোমিনিকান রিপাবলিক এবং হাইতি।
এশিয়ার ক্ষেত্রে এই খরা ও আবহাওয়ার ঝুঁকি বৈশ্বিক প্রধান বাজারগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এল নিনোর প্রভাবে ভারতের একটি বড় অংশে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে ধান ও ভুট্টার মতো ফসলের চাষাবাদ, যা মূলত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল, তা ভরা মৌসুমেই চরম সংকটের মুখে পড়বে। এর আগে ২০১৫ সালেও প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে ভুট্টা ও ধানের ফলনে বিপর্যয় ঘটেছিল, যা খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল শস্যগুলোর দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। বর্তমানে পাকিস্তান ও ভারত থেকে শুরু করে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম এবং পূর্বদিকের ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব তিমুর পর্যন্ত এই কৃষিভিত্তিক খরার ঝুঁকি বিস্তৃত রয়েছে।
প্রিসিশন ম্যাপিং বা নিখুঁত মানচিত্রে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের সুযোগ
এফএও-র এই নিখুঁত উপগ্রহ মানচিত্রের (প্রিসিশন ম্যাপিং) মাধ্যমে কোনো কোনো অঞ্চলের ঝুঁকির মাত্রা মাত্র এক বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যেও সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা সম্ভব। এর ফলে সরকারগুলো তাদের সম্পদ সব জায়গায় ছড়িয়ে না দিয়ে, সরাসরি সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে সবটুকু মনোযোগ দিতে পারবে।
এফএও-র প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক কর্মকর্তা রিকার্দো সোলদান বলেন, মানচিত্রের এই সূক্ষ্ম বিবরণ একটি সরকারের কাজের ধরন বদলে দিতে পারে। সব জায়গায় নামমাত্র সম্পদ না বিলিয়ে, প্রশাসন এখন নির্দিষ্ট হটস্পট বা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজর দিতে পারবে। ফলে নগদ অর্থ সহায়তা, পানি ও সেচ সুবিধা, গবাদিপশুর খাদ্য এবং অন্যান্য জরুরি উপকরণগুলো একদম সঠিক জায়গায় সরাসরি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
দুর্যোগের আগে আগাম পদক্ষেপ নিলে যে সুফল পাওয়া যায়, তার প্রমাণ ইতিমধ্যে মিলেছে। ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো আঘাত হানার ঠিক আগে, দক্ষিণ আফ্রিকায় মৌসুম শুরুর পূর্বেই একটি আঞ্চলিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর আওতায় ৭টি দেশের ২০ লাখেরও বেশি মানুষের জন্য প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার বরাদ্দ করা হয়। ওই অর্থ দিয়ে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে বীজ ও গবাদিপশু পালনের উপকরণ দেওয়া হয় এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস পৌঁছানো হয়। একইভাবে মধ্য আমেরিকায় খরা-সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ফসলের বীজ সময়মতো বিতরণ করার ফলে স্থানীয় পরিবারগুলো সবজি উৎপাদন করতে পেরেছিল, যা তাদের পারিবারিক খাদ্যের জোগান স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
ঝুঁকির বিষয়টি আগেভাগে জানা গেলে কৃষক ও পশুপালকেরা চাষাবাদের মূল মৌসুম পুরোদমে শুরু হওয়ার আগেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যেমন—ফসল রোপণ কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া, খরা-সহনশীল ফসল বেছে নেওয়া, গবাদিপশুর জন্য খড় বা গোখাদ্য মজুত করা এবং বাড়তি পানির উৎস নিশ্চিত করা। তবে এই নিখুঁত পূর্বাভাসকে মাঠপর্যায়ে সুরক্ষায় রূপান্তর করতে হলে জাতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মাঠপর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ নেটওয়ার্কের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন। এতে করে সতর্কবার্তাগুলো একদম সঠিক সময়ে কৃষকদের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।