শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও কুমিল্লা জেলা পশ্চিমের সাবেক সভাপতি জিসান মিয়া প্রধান। ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর লাকসামে উদ্ধার ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও জোর করে ভ্রুণ নষ্ট করার অভিযোগে মামলা হয়েছে। পুলিশের দাবি, জিসানকে কেউ অপহরণ করেনি; তিনি নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন। গতকাল শুক্রবার রাতে কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান আজ শনিবার বেলা একটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, ভুক্তভোগীর করা মামলায় জিসান মিয়া প্রধান আসামি। তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তিনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশি হেফাজতে চিকিৎসাধীন।
এর আগে গতকাল রাত পৌনে ১০টার দিকে কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশন এলাকায় অচেতন অবস্থায় জিসানকে উদ্ধার করা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
জিসান মিয়া (২৮) ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং সংগঠনটির কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ১১ জুন রাতে জিসান নিখোঁজ হয়েছেন জানিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই রাসেল আহম্মেদ দাউদকান্দি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডির পর জেলা পুলিশের একাধিক দল তাঁকে উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করে।
অনুসন্ধানকালে পুলিশ জানতে পারে, কয়েক মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে এক বিধবা নারীর (২৫) সঙ্গে জিসানের পরিচয় হয় এবং তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পুলিশের ভাষ্য, প্রেমের সম্পর্কের জেরে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর জিসান ওই নারীকে ভ্রুণ নষ্ট করার জন্য চাপ দেন এবং একপর্যায়ে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে গর্ভপাত ঘটানো হয়। পরে ওই তরুণী জিসানকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে তিনি ১২ জুন বিয়ে করবেন বলে সম্মতি দেন। তবে বিয়ে এড়াতে ১১ জুন রাতেই তিনি নাটক সাজিয়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আত্মগোপনে যাওয়ার পর জিসান তাঁর চাচাতো ভাইয়ের মাধ্যমে থানায় নিখোঁজের জিডি করান। নিখোঁজের অনুসন্ধান চলাকালে গতকাল রাতে লাকসাম এলাকা থেকে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
এদিকে জিসান উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর গতকাল রাতে ওই নারী বাদী হয়ে দাউদকান্দি মডেল থানায় জিসানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধারায় করা হয়েছে। এ ঘটনায় ধর্ষণ ও ভ্রুণ নষ্টের অভিযোগ আনা হয়েছে।
কুমিল্লার সহকারী পুলিশ সুপার (দাউদকান্দি-চান্দিনা সার্কেল) খলিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে জিসানকে কেউ অপহরণ করেনি। তিনি নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন। এক নারীকে ধর্ষণ ও নারীর সঙ্গে প্রতারণামূলক ঘটনার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় ভ্রুণ নষ্টসহ একাধিক অভিযোগ করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
জিসানের পরিবার থেকে দাবি করা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে দাউদকান্দিতে আসেন জিসান। রাত আটটার দিকে তিনি বাবাকে ফোন করে দাউদকান্দিতে পৌঁছানোর কথা জানান। এর পর থেকে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে খুঁজে না পেয়ে থানায় জিডি করা হয়।
এদিকে জিসান মিয়াকে অপহরণ করা হয়েছে জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান গতকাল বিকেলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। এতে তিনি লেখেন, ‘১৮ ঘণ্টা অতিক্রম হওয়ার পরও তিনি এখন পর্যন্ত উদ্ধার না হওয়ায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী করছে?’
এ ছাড়া ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেওয়া হয়। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘একটি চক্র জিসানকে অপহরণ করে তাঁর পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করছে এবং যে ফোন নম্বর ব্যবহার করে মুক্তিপণ চাওয়া হচ্ছে, সেটিও এখনো সক্রিয় রয়েছে। অপহরণকারীদের ফোন নম্বরসহ সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রশাসনের কাছে থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে তারা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেও পুলিশ হেডকোয়ার্টার, পুলিশের আইজিপি ও র্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত সন্ধান ও উদ্ধারের দাবি জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাই আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি।’
এ বিষয়ে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম আজ দুপুরে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়েঘটিত বিষয়টি গতকাল বিকেলে মেয়ের পরিবার আমাদের জানায়। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। যদি উপযুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে এটি প্রমাণিত হয়, তাহলে আমরা জিসানের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব। তবে পুরো বিষয়টি সাজানো কি না, সে বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত।’