মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
৮ এপ্রিল ২০২৬ বিকেলে বাগেরহাটের হজরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজারের দিঘির ঘাটে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে, এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ভিডিওতে দেখা যায় একটি কুকুর ঘাটের সিঁড়িতে হাল্কা পানিতে দাঁড়িয়ে পাড়ে অবস্থানরত মানুষের নিকট উদ্ধারের আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে, অপরদিকে মাজারের দর্শনার্থী আর কৌতূহলী মানুষজন ভয়ে অথবা কুকুরের শেষ পরিণতি কি হয় তা দেখার অপেক্ষায় ঠায় দাঁড়িয়ে।
এ সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে অভ্যস্ত একটি কুমির এবং শেষ পর্যন্ত ঘটে যায় অনিবার্য সেই মর্মান্তিক পরিণতি। ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কুকুরটির পা ইচ্ছাকৃতভাবে বেঁধে রাখা হয়েছিল কি না, কিংবা তাকে চলাচলের অযোগ্য করে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে।
ময়নাতদন্ত ও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুকুরটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরের মুখে দেওয়া হয়নি, কুকুরটি ছিল জলাতঙ্কে আক্রান্ত (প্রথম আলো, ১৬ এপ্রিল ২০২৬)।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে আরও একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, ১১ এপ্রিল ২০২৬ চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ইছাখালি ইউনিয়নের মুহুরী প্রকল্প এলাকায় দুইজন মানুষ মিলে একটি চিত্রা হরিণকে নির্মমভাবে হত্যা করছে (প্রথম আলো, ১৫ এপ্রিল ২০২৬)। ২৬ মার্চ ২০২৬ রাতে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় বিভিন্ন চরাঞ্চল ও মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্দুক দিয়ে গুলি করে ৭ বস্তায় প্রায় ৪ মণ পরিযায়ী পাখি শিকার করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আ স ম হাদিউল ইসলাম ভূঁইয়া (৮১), আবরার উদ্দিন আহমেদ (৭০), হাজী ওসমান আলী (৭৭), মাজহারুল হক কোরেশী (৭০), আবদুল্লাহ নূর (৭২) এবং আরিক আহমেদ (২৭) নামের ছয় ব্যক্তি (প্রথম আলো, ২৭ মার্চ ২০২৬)।
১৫ এপ্রিল ২০২৬ চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে ধান খাওয়ার অভিযোগে ২৫ থেকে ৩০টি ছোট ছোট বাবুই পাখির ছানা মেরে ফেলে বাছা মিয়া (ইত্তেফাক, ১৬ এপ্রিল ২০২৬)।
এগুলো প্রত্যেকটি একেকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং এরকম হাজারও ঘটনা প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে ঘটছে। এ ঘটনাগুলো আমাদের নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে পৃথিবীতে মানুষ-প্রাণীর সম্পর্ক আসলে কোন পথে।
মানবজাতি উৎকর্ষতায় প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, অভিযানে যাচ্ছে চন্দ্র থেকে মঙ্গলে, মহাকাশে খুঁজছে প্রাণের অস্তিত্ব। নিজের আশেপাশের প্রাণীকুল, সে হোক গৃহপালিত বা বন্য তাদের প্রতি আমাদের আচরণ কতটা মানবিক? নাকি সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকেই মানুষ অন্য প্রাণের প্রতি অসহিষ্ণু!
আদিমকাল থেকেই মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক ছিল জটিল, যা প্রাথমিক পর্যায়ে শিকারি প্রাণীর অবশিষ্টাংশ ভক্ষণ ও তাদের সাথে প্রতিযোগিতা থেকে বিকশিত হতে হতে একসময় কিছু প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সাহচর্য এবং কালের পরিক্রমায় বাস্তুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
সে সময়ে প্রাণীরা শুধুই খাদ্যের উৎস হিসেবেই নয় বরং রক্ষক এবং আধ্যাত্মিক প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো যার প্রমাণ মেলে গুহাচিত্র ও সমাধিস্থলে পশুর দেহাবশেষের ব্যবহার থেকে। শিকারি-সংগ্রাহক যুগে মানুষ নিজেকে প্রকৃতির প্রভু নয় বরং একটি বৃহত্তর জীবমণ্ডলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করত।
ইতিহাসবিদ এবং জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক ইউভাল নোয়াহ হারারি তার ‘স্যাপিয়েন্স: অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ হিউমানকাইন্ড (Sapiens: A Brief History of Humankind)’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সেই সময় মানুষের বেঁচে থাকা নির্ভর করত প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপর।
ই.ও. উইলসন তার ‘দ্য ডাইভারসিটি অফ লাইফ (The Diversity of Life)’ বইয়ে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, একটি প্রজাতির ক্ষতি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে বিপন্ন করতে পারে। কিন্তু কৃষি বিপ্লব ও পরবর্তীতে শিল্পায়নের পর মানুষ ধীরে ধীরে সেই সহাবস্থান ভেঙে প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার শুরু করে।
এই আধিপত্য আজ এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে যেখানে মানুষ এখন প্রকৃতির সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি। দার্শনিক হ্যান্স জোনাস তার ‘দ্য ইম্পেরেটিভ অফ রেসপন্সিবিলিটি (The Imperative of Responsibility)’ বইতে বলেন, আধুনিক যুগে মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও সমগ্র জীবমণ্ডলের প্রতি বিস্তৃত হওয়া। অর্থাৎ, মানুষ প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক নয়, বরং তার রক্ষক হওয়ার দায়ে আবদ্ধ।
এই তাত্ত্বিক আলোচনা এবং বর্তমান বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলোয় দেখা যায়, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা আমাদের সমাজে একটি উদ্বেগজনক মাত্রা পেয়েছে।
মানুষ অনেক সময় বিপদগ্রস্ত প্রাণীকে রক্ষা না করে ভিডিও ধারণ করে, কিংবা বিনোদনের জন্য নির্যাতন করে যা গভীর সামাজিক অসংবেদনশীলতার বহিঃপ্রকাশ।
দার্শনিক মার্থা নুসবাউম তার সম্প্রতি প্রকাশিত ‘জাস্টিস ফর অ্যানিমালস: আওয়ার কালেকটিভ রেন্সপন্সিবিলিটি (Justice for Animals: Our Collective Responsibility)’ বইয়ে সমগ্র প্রাণিজগতকে বিশ্লেষণ করেছেন বিস্ময়, মুগ্ধতা ও সহানুভূতির দৃষ্টিতে, যাতে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলা যায় যেখানে মানুষের সাথে প্রাণীদের সহাবস্থান নিশ্চিত হবে। তিনি বলেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে শুধু মানুষের নয়, প্রতিটি প্রাণীরও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ থাকা উচিত।
অন্যদিকে পিটার সিঙ্গার তার ‘অ্যানিমেল লিবারেশন (Animal Liberation)’ বইতে বলেন, কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতাই নৈতিক বিবেচনার ভিত্তি, সুতরাং প্রাণীর কষ্টকে উপেক্ষা করা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। তিনি প্রজাতিভিত্তিক বৈষম্যের বিরোধিতা করেন অর্থাৎ কেবল কোনো জীব একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত বলে তাকে কম গুরুত্ব দেওয়া অন্যায়।
আর জেন গুডঅল তার ‘ইন দ্য শ্যাডো অফ ম্যান (In the Shadow of Man)’ এ দেখিয়েছেন, প্রাণীদের আবেগ, সম্পর্ক ও সামাজিকতা রয়েছে ফলে তারা নিছক বস্তু নয়। অনেক দার্শনিক আবার এটাও বলেন যে, প্রাণীদের নিজস্ব অধিকার রয়েছে, যা মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়।
প্রাণীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা দেখে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসে যায়, আইন কি যথেষ্ট? বাস্তবতা বলছে, আইন থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। সমাজে যখন প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা ‘স্বাভাবিক’ হয়ে যায়, তখন কেবল আইন দিয়ে তা প্রতিরোধ করা অসম্ভব।
গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাণীর প্রতি সহিংসতা অনেক সময় মানুষের প্রকৃতি বিচ্ছিন্নতা, অজ্ঞানতা, ক্ষমতার অপব্যবহার বা সহমর্মিতার অভাবের বহিঃপ্রকাশ।
সবশেষে, একটি অনিবার্য সত্য আমাদের স্বীকার করতেই হবে প্রকৃতি কোনো একক প্রজাতির জন্য তৈরি হয়নি। মানুষ যেমন বাঁচতে চায়, তেমনি প্রতিটি প্রাণীরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। এই অধিকার মানুষের পছন্দ বা অনুমতির ওপর নির্ভর করে না, এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক বিধান।
মানুষ আজ যে আধিপত্য অর্জন করেছে, তা তাকে এই সত্য থেকে অব্যাহতি দেয় না; বরং এই সত্য রক্ষা করার দায়িত্ব আরও গভীরভাবে তার ওপর আরোপ করে।
অতএব, আমরা পছন্দ করি বা না করি প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণ সমানভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রাখে। এই নীতিকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করাই হবে মানবসভ্যতার প্রকৃত উন্নতি এবং টিকে থাকার একমাত্র পথ।
আশীষ দত্ত : সহকারী অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)