সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
সম্প্রতি গবেষণার তথ্য সংগ্রহের অংশ হিসেবে সরকারি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়েছে। একাধিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দেখলাম, নতুন কারিকুলামে খেলাভিত্তিক শিখনের যে ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন ধরনের খেলার কর্নার রয়েছে, শিশুদের জন্য খেলনা ও শিক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থাও আছে। খেলনা ও উপকরণগুলো টেকসই হলে শিশুদের খেলার মাধ্যমে শেখার সুযোগ সারা বছর ধরে বজায় থাকে। কোথাও এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করছে, কোথাও আবার নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে গিয়ে দুটি বড় সমস্যা স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে।
প্রথমত, শিক্ষার্থী উপস্থিতি অনিয়মিত। একটি বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৯০ জন, কিন্তু উপস্থিত ছিল মাত্র ৪০ জনের মতো। পর্যবেক্ষণ করা তিনটি বিদ্যালয়ের প্রতিটিতেই মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক বা তারও বেশি অনুপস্থিত ছিল। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বৃষ্টি, শীত, অতিরিক্ত গরম, ছুটি কিংবা গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার মতো নানা কারণে দীর্ঘ সময় শিশুদের স্কুলে অনুপস্থিতি দেখা যায়। আবার অনেক শিশু বছরের মাঝামাঝি সময়ে ভর্তি হয়।
এই পরিস্থিতিতে শিশুদের শেখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা শিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। একই শ্রেণিতে কেউ নতুন, কেউ নিয়মিত, কেউ দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ফলে পাঠ পরিকল্পনা ও শেখানোর গতি বজায় রাখা কঠিন হয়। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষকের কর্মউদ্দীপনা ও আনন্দদায়ক পাঠদানের উপরও।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের পরিচিত সমস্যা সীমিত সুযোগ-সুবিধা, কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত স্বীকৃতির ঘাটতি। প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক গড়ে তোলার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, প্রণোদনা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের বিষয়টি কি একই গুরুত্ব পায়?
আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত মানদণ্ড হলো ইউনেসকোর সুপারিশ। ইউনেসকো-এর মতে, একটি দেশের শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া উচিত মোট জাতীয় বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ অথবা জিডিপির ৪-৬ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশ। জিডিপির অনুপাতেও এই ব্যয় আন্তর্জাতিকভাবে সুপারিশকৃত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।
তবে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দের আলোচনার পাশাপাশি আরেকটি বিষয় গুরুত্ব পাওয়া উচিত এই বরাদ্দের কতটা শিশুদের প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ব্যয় হচ্ছে। গবেষণা বলছে, শিক্ষাজীবনের প্রথম বছরগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শেখা এবং মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, একটি শিশুর মস্তিষ্কের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ বিকাশ জীবনের প্রথম কয়েক বছরেই সম্পন্ন হয়। এই সময়ে যথাযথ শিক্ষা, পুষ্টি, সুরক্ষা এবং পরিচর্যা না পেলে পরবর্তী জীবনে সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জেমস হেকম্যানের মতে, মানুষের জীবনের অন্য যেকোনো পর্যায়ের তুলনায় প্রারম্ভিক শৈশবে বিনিয়োগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিফলন সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুর বিকাশ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশে বিনিয়োগ করলে তার সুফল ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্র সবই দীর্ঘমেয়াদে লাভ করে।
বিশ্বব্যাংকও বারবার বলছে, প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে বিনিয়োগ না বাড়ালে ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা কঠিন হবে কারণ এ পর্যায়েই মস্তিষ্কের প্রায় ৯০ শতাংশ বিকাশ সম্পন্ন হয়। বয়স অনুযায়ী মস্তিষ্কের বিকাশের আনুমানিক দশা অনেকটা এমন গবেষণাভেদে দেখা যায়, এক বছর বয়সে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছে যায় এবং পাঁচ বছর বয়সে তা প্রায় ৯০-৯২ শতাংশে উন্নীত হয়। কাজেই শিশুর প্রারম্ভিক বয়সের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। আর আজকের শিশুরাই আগামী দিনের শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তা, গবেষক, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং নীতিনির্ধারক।
দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ। শিক্ষকরা কি শিশু বিকাশ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও হালনাগাদ প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন? শিশুদের ভাষা বিকাশ কীভাবে ধাপে ধাপে ঘটে, খেলাভিত্তিক শিখন কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, অথবা কীভাবে বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রী কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হয় এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদান, ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহার এবং আধুনিক শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি।
আমার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষক আন্তরিক হলেও খেলাভিত্তিক শিক্ষা বা শিশু-কেন্দ্রিক শিক্ষণ পদ্ধতি বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত সহায়তা পান না। অথচ নতুন কারিকুলামের সফল বাস্তবায়ন অনেকাংশে শিক্ষকের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং সৃজনশীলতার ওপর নির্ভর করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রেণিকক্ষের উপকরণ ও শিশু কর্নারের টেকসই নির্ভর ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সরবরাহ করা উপকরণ কয়েক মাসের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায় বা অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে খেলাভিত্তিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এসব উপকরণের রক্ষণাবেক্ষণ, নবায়ন এবং স্থানীয়ভাবে উপকরণ তৈরির উদ্যোগের জন্যও পর্যাপ্ত বাজেট প্রয়োজন।
এছাড়া শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ, মেন্টরিং এবং কার্যকর প্রণোদনা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। মাঠপর্যায়ে আমার পর্যবেক্ষণ বলছে, বিদ্যমান সম্পদ দিয়ে আরও ভালো মানের শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা সম্ভব। কিন্তু বিভিন্ন কাঠামোগত ও পেশাগত কারণে অনেক শিক্ষকের মধ্যে কর্মপ্রেরণার ঘাটতি দেখা যায়। এই বাস্তবতা পরিবর্তন করতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলে। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করতে হবে। আর সেই ভিত্তি তৈরি হয় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে।
আমরা প্রায়ই প্রাক-প্রাথমিক স্তরকে শুধু ‘শিশু শ্রেণি’ হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি একজন মানুষের শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি নির্মাণের সময়। এই পর্যায়েই ভাষা, সামাজিকতা, কৌতূহল, সমস্যা সমাধান, আত্মবিশ্বাস এবং শেখার প্রতি আগ্রহের বীজ রোপিত হয়। শিক্ষা গবেষণায় একটি প্রচলিত কথা আছে, ‘বিনিয়োগ যত আগে, তার ফল তত বেশি’।
তাই শিশুদের জন্য বাজেট বরাদ্দকে ব্যয় হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। নতুন রাস্তা, সেতু বা অবকাঠামো নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই অবকাঠামো ব্যবহার করবে যে মানুষ, সেই মানুষ গড়ার কাজটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আর মানুষ গড়ার কাজ শুরু হয় শৈশব থেকেই।
এখানে উল্লেখ্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে বরাদ্দ ভিন্ন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের সমন্বিত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উন্নত ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলো শিক্ষা বাজেটের তুলনামূলকভাবে বড় অংশ প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যয় করে। সুইডেন ব্যয় করে ১০-১২%, নরওয়ে ৯-১১%, ফিনল্যান্ড ৮-১০%, ফ্রান্স ৮-১০%, যুক্তরাজ্য ৬-৮%, অস্ট্রেলিয়া ৫-৭%, দক্ষিণ কোরিয়া ৫-৬%, ভিয়েতনাম ৪-৬%, ভারত ২-৪% আর বাংলাদেশে ১% এরও কম! দেখা যাচ্ছে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য আলাদা করে রাখা বরাদ্দ খুবই সীমিত!
কাজেই, জাতির ভবিষ্যৎ যদি সত্যিই আমাদের অগ্রাধিকার হয়, তবে বাজেট আলোচনায় শিশুদের স্থানও অগ্রাধিকার পেতে হবে। মনে রাখতে হবে বাজেট কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি একটি জাতির অগ্রাধিকার নির্ধারণের দলিল।
আমরা যদি উন্নত বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে সেই যাত্রার শুরু হতে হবে শৈশব থেকে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুর বিকাশ এবং শিক্ষকদের পেশাগত সক্ষমতায় বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয় এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ। চলুন, এমন বিনিয়োগকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করি।
তথ্যঋণ:
১। UNESCO Global Education Monitoring (GEM) Reports
২। OECD Education at a Glance
৩। UNICEF Early Childhood Development Reports
৪। World Bank Investing in Early Childhood Development Reports
৫। Bangladesh National Budget 2026–27
ফারহানা মান্নান : প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, শৈশব; শিক্ষা বিষয়ক গবেষক