বৃহঃস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩


প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর

তারেক রহমান-আনোয়ার ইব্রাহিমের বৈঠক ও কূটনৈতিক বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:২৫ জুন ২০২৬, ১৩:৪৮

ছবি ‍: সংগৃহীত

ছবি ‍: সংগৃহীত

শুরুতে জল্পনা ছিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে চীনকে বেছে নেবেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সাথে প্রায় দুইবছর ধরে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন সত্ত্বেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতির ধারা কাটিয়ে উঠতে সাম্প্রতিক সময়ে দুইপক্ষই আন্তরিক।

দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন বেশ কয়েকটি দেশের সরকার প্রধানের কাছ থেকে। এমন বাস্তবতায় একটি মুসলিম দেশ মালয়েশিয়াকেই তিনি বেছে নিলেন তার প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে। পরবর্তীতে তার চীনে গমনকে কেবল দ্বিপাক্ষিক সফর হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। সেখানে তার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশ নেওয়া, যা আমাদের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের প্রতি সরকারের বিশেষ দৃষ্টিকেই ইঙ্গিত করে।

মালয়েশিয়াকে প্রথম সফর হিসেবে বেছে নেওয়ার আরও কিছু গুরুত্ব রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রায় দুইবছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়া। ১৯৭৮ সালে মাত্র কয়েকজন শ্রমিক পাঠানোর মধ্য দিয়ে যে শ্রমবাজার সেদেশে শুরু হয়, সময়ের ধারাবাহিকতায় সেটা এখন লাখ লাখ মানুষের জীবন এবং জীবিকার সাথে জড়িয়ে রয়েছে।

সম্ভাবনাময় এই শ্রমবাজারকে বছরের পর বছর নিয়ন্ত্রণ করেছে মাত্র কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সি। শ্রমবাজার ঘিরে নানা অব্যবস্থাপনার জেরে দফায় দফায় মালয়েশিয়া বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশের শ্রমিক নেওয়া। আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সাথে শ্রমিক নেওয়া সংক্রান্ত চুক্তি হয় ১৯৯২ সালে।

এরপর থেকে প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় শ্রমিক গেছে দেশটিতে। বর্তমানে শ্রমিকদের সংখ্যার দিক দিয়ে মালয়েশিয়া আমাদের জন্য চতুর্থ বৃহত্তম শ্রমবাজার (সৌদি আরবে ৫৮ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৪ লাখ, ওমানে ১৯ লাখ), যেখানে কাজ করছে ১৪ লাখের বেশি শ্রমিক।

সংখ্যার বিবেচনায় এটি অনেক বেশি মনে হলেও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য সেরকম আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে না। কেবল এর চেয়ে ভালো বিকল্প না থাকার কারণে এই প্রবণতা বেশি।

মালয়েশিয়া যেতে কর্মী প্রতি সরকার ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে এজেন্সিগুলোর দৌরাত্ম্য ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে একেকজন কর্মীর। এর মূল কারণ ২০২২ সালে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার পর মাত্র ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়, পরে অপরাপর রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই সংখ্যা আরও ৭৫টি বাড়ানো হলেও এক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাবের কথা জানানো হয়েছিল দুই সরকারকেই।

তারপরও দীর্ঘদিন বন্ধের পর গতবছর ৩ লাখ ৫১ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক সে দেশে যায়। অব্যবস্থাপনা বন্ধ হয়নি এতকিছুর পরও, ফলে ২০২৪ সাল থেকে আবারও বন্ধ হয়ে যায় দেশটিতে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে এই অচলাবস্থা অবসানে এবার মনোযোগ দিয়েছে সরকার। সেই সাথে কেবল এই একটি বিশেষ বিষয়ের ওপর নির্ভর না করে আরও বৃহত্তর পরিসরে দুই দেশ কীভাবে কাজ করতে পারে, সে লক্ষ্যে এই সফরে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার প্রেক্ষিতে স্বাক্ষরিত হয়েছে ১৪টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক।

দুই নেতার আলোচনা আইসিটি, জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, হালাল শিল্প, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য উচ্চ-মূল্যবান খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত ছিল।

এছাড়াও সেদেশে অবস্থানরত শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক প্রায় ২ হাজার কর্মীর মুক্তিসহ শ্রমবাজার নতুন করে উন্মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে অভিন্ন সমস্যার বিষয়ে মতবিনিময় করেছে এবং এক্ষেত্রে একত্রে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সংগঠন আসিয়ানের ডায়ালগ পার্টনার হতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা কামনা করেছে। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বহুমুখীতা আনয়নের লক্ষ্যে রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগদানের আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

এই সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়েছে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম এই সফরকে তারাও উদযাপন করেছে। এটি আমাদের সরকারের দিক থেকে একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, যা দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথকে নানামাত্রিক রূপ দিতে পারে।

মালয়েশিয়া থেকেই প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চীনের দালিয়ানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে যোগদান শেষে বর্তমানে অবস্থান করছেন রাজধানী বেইজিং এ। চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সফরের শেষদিনে তিনি বৈঠক করবেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্টের সাথে।

মূলত দুটি দেশে সফর হলেও প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে তিনটি বিশেষ উপলক্ষ রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে মালয়েশিয়া এবং চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নে সরকারি পর্যায়ের আলোচনা এবং দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে যোগ দেওয়া।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম হচ্ছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি অলাভজনক সংস্থা। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর অভিন্ন সমস্যা সমাধানকল্পে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে খুঁজে বের করা। এবছর এই সম্মেলনটির আয়োজক দেশ চীন।

বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র এবং সরকার প্রধান এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। এদের অনেকের সাথেই সাইডলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একটি বিপ্লবোত্তর সময়ে বাংলাদেশের নির্বাচিত নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সবার আকর্ষণ ছিল ভিন্ন রকম। এই সম্মেলনে যোগ দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো ব্যাখ্যা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

আগামী পাঁচ বছরে ২৫০ মিলিয়ন বৃক্ষরোপণে এবং ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনরায় খননের বিষয়টি উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। বিশাল এই ফোরামে আরও বৃহত্তর পরিসরে বিনিয়োগ আকর্ষণেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ সঠিকভাবে নিতে পারলে বড় ধরনের সাফল্য আসতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের শেষদিনে বেইজিং-এ বিনিয়োগ সম্মেলন এই সফরের মূল আকর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে চীনের বিশাল বিনিয়োগ আকর্ষণে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অনুমোদন দিয়েছে সরকার এবং এ লক্ষ্যে ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, বরাদ্দ হয়েছে ৮শ একর জায়গা।

চীনের পক্ষ থেকেও ইতিমধ্যে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকার ঋণ সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ঢাকার কেরানীগঞ্জে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্যও।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে চীনের বিশাল বিনিয়োগ দুই দেশের অর্থনীতিতেই অপার সম্ভাবনা আনতে পারে। বিডার আয়োজনে বেইজিং এর বিনিয়োগ সম্মেলনকে ঘিরে তাই আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারে নতুন চাঞ্চল্য।

এসবের বাইরেও চীন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সাথে বৈঠকে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, যার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ছাড়াও বাংলাদেশের উন্নয়নে চীনের আর্থিক, ঋণ সহায়তা এবং কারিগরি বিষয়েও বিশেষ সহায়তার অঙ্গীকার আসতে পারে।

গত বছর দুই দেশ তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর অতিক্রম করেছে। এই সম্পর্কের শুরু থেকেই ধীরে ধীরে দুই দেশের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে নানামাত্রিক সহযোগিতার ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। পারস্পরিক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এই সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলবে–এটা নিশ্চিতভাবেও বলা যায়।

ড. ফরিদুল আলম : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৩:৪৫ - ৫:০৭ ভোর
যোহর ১২:০০ - ৪:৩১ দুপুর
আছর ৪:৪১ - ৬:৪৩ বিকেল
মাগরিব ৬:৪৮ - ৮:১১ সন্ধ্যা
এশা ৮:১৬ - ৩:৪০ রাত

বৃহঃস্পতিবার ২৫ জুন ২০২৬