বৃহঃস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩
প্রতীকী ছবি
সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের প্রথম ধাপ হলো পরিবার। পরিবারের মূল ভিত্তি হলো স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্ক। সমসাময়িক বাস্তবতায় নানাবিধ টানাপোড়েনের কারণে পারিবারিক সুখ-শান্তি বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। এই মুহূর্তে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পারিবারিক জীবন আমাদের জন্য হতে পারে সর্বোত্তম অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি ছিলেন একাধারে একজন দায়িত্বশীল স্বামী, স্নেহময় পিতা ও আদর্শ দাদা-নানা।
পারিবারিক জীবনকে শান্তিময় করতে মহানবী (সা.)-এর দেখানো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
খোদাভীতি, পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্মান
একটি সফল দাম্পত্য জীবন ও সুখী পরিবারের মূল চাবিকাঠি হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালো সম্পর্ক। মহানবী (সা.) দেখিয়েছেন যে, দাম্পত্য জীবনে মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে হলে পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ থাকা অপরিহার্য। তিনি নিজের পরিবারের প্রতি সর্বদা দয়ালু, কোমল, সহনশীল ও সম্মান প্রদর্শনকারী ছিলেন।
পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য আরাম, পবিত্রতা ও সুরক্ষার প্রতীক।
ভালোবাসা দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর করে, তবে ইসলামে তাকওয়া বা খোদাভীতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বাহ্যিক বা আবেগীয় ভালোবাসা কিছুটা কমলেও তাকওয়া থাকলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা কখনো শেষ হয় না।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের বিখ্যাত পণ্ডিত হাসান আল-বসরী এক বাবাকে তার মেয়ের বিয়ের পাত্র চয়নের ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, তোমার মেয়েকে এমন এক ব্যক্তির কাছে বিয়ে দাও যার অন্তরে তাকওয়া বা খোদাভীতি আছে। কারণ সে যদি তোমার মেয়েকে ভালোবাসে তবে তাকে সম্মান করবে, আর যদি কোনো কারণে ভালোবাসায় কমতিও আসে, সে অন্তত তার ওপর জুলুম করবে না।
পরিবারের প্রতি সদয় আচরণ
ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারেন না, যতক্ষণ না সে তার পরিবারের প্রতি সদয় হয়। মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন যখন তৎকালীন আরব সমাজে নারীর কোনো অধিকার ছিল না। নারীদের শুধু সম্পত্তি হিসেবে দেখা হতো এবং কন্যাসন্তানদের জ্যান্ত কবর দেওয়া ছিল অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। সেই অন্ধকার যুগে মহানবী (সা.) নারীদের সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ডাক দেন।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, যার দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে এবং সে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তাদের সঙ্গে সদয় আচরণ করে, তবে ওই কন্যাসন্তানরাই তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে।
দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সদয় আচরণই হচ্ছে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ। অন্য এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে সেরা।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, মুমিনদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী হলেন সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর। আর তোমাদের মধ্যে তারাই উত্তম, যারা তাদের স্ত্রীদের কাছে উত্তম।
মহানবী (সা.)-এর জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি তার স্ত্রীদের প্রতি অত্যন্ত কুশলী ও স্নেহশীল ছিলেন। হজরত আয়েশা (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে তিনি প্রায়ই তার কোলে মাথা রেখে শুতেন এবং আদর করে তাকে হুমায়রা বা লালচে ফর্সা বলে ডাকতেন। ঘরের কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করা, নিজের কাপড় নিজে ধোয়া—এসবে মহানবী (সা.) কখনো দ্বিধা করেননি। চরম ধৈর্যের পরীক্ষার মুহূর্তেও তিনি কখনো পরিবারের প্রতি কোনো কঠোর ভাষা বা আচরণ করেননি।
পারস্পরিক যোগাযোগ ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া
যেকোনো সম্পর্কের প্রাণ হলো সুন্দর যোগাযোগ বা কথোপকথন। মহানবী (সা.)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তার কোমল কণ্ঠ ও সুন্দর বাচনভঙ্গি। তিনি কখনো কারও সঙ্গে কটু কথা বলেননি। স্ত্রী ও সন্তানদের কোনো বিষয়ে সংশোধন করার প্রয়োজন হলেও তিনি অত্যন্ত নরমভাবে কথা বলতেন। মহানবীর পরিবারে সবার কথা শোনার ও বলার চমৎকার পরিবেশ ছিল। তিনি তার স্ত্রীদের মতামত ও পরামর্শকে অত্যন্ত মূল্যায়ন করতেন, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
কন্যা হজরত ফাতিমা (রা.)-কে মহানবী (সা.) এতটাই ভালোবাসতেন যে, ফাতিমা যখনই তার ঘরে আসতেন, তিনি নিজে আসন থেকে উঠে দাঁড়াতেন, তাকে চুম্বন করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাকে বসাতেন। পরিবার ও সন্তানদের প্রতি তার এই গভীর মমতা ও কোমলতা আজ প্রতিটি পরিবারের জন্য এক পরম শিক্ষণীয় বিষয়। একটি ভালোবাসাময় ও শান্তিময় পরিবার গঠনে মহানবী (সা.)-এর এই আদর্শগুলো যুগে যুগে প্রতিটি মানুষের জন্য সেরা অনুপ্রেরণা।