বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
ফাইল ছবি
দেশের ফল ও সবজির অন্যতম উৎপাদন অঞ্চল নরসিংদী। আর এ জেলার নাম উচ্চারণ করলেই মনে পড়ে সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ মৌসুমি ফল লটকনের কথা। ‘লটকনের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত এ জেলায় চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন হওয়ায় চাষিদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি।
এক সময় বন-জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে জন্মানো লটকনের তেমন কদর ছিল না। কিন্তু পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাজারে চাহিদা বাড়ায় ফলটি এখন লাভজনক অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ‘বুগি’ নামে পরিচিত নরসিংদীর লটকন ইতোমধ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে। বর্ষা মৌসুমে গাছের কাণ্ডজুড়ে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা লটকন প্রকৃতিতে যোগ করে ভিন্ন সৌন্দর্য।
বর্তমানে জেলার শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলার হাজারো পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস লটকন চাষ। অনেক শিক্ষিত তরুণও এই ফলের বাগান করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদীর লাল মাটিতে ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান থাকায় সেখানে লটকনের ভালো ফলন হয়। চলতি মৌসুমে জেলায় ২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন ৩০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী যার সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা।
তবে বাম্পার ফলনের মাঝেও বাজারদর নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে চাষিদের। তাদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতেই অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রতি কেজি লটকন ৩০ থেকে ৫০ টাকা কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে প্রত্যাশিত লাভ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
লটকন চাষি করিম চৌধুরী বলেন, তিনি নিজেই বাগানের লটকন পাইকারি বাজারে বিক্রি করেন। এতে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়। চলতি মৌসুমে ৩ বিঘা জমির লটকন বিক্রি করে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন।
তিনি জানান, লটকন চাষে পরিচর্যার খরচ তুলনামূলক কম হলেও বল্লা পোকার আক্রমণ বড় সমস্যা। এ পোকা ফলের গুটিতে ছিদ্র করে, ফলে আক্রান্ত গুটি ঝরে পড়ে। কীটনাশকযুক্ত ফাঁদ ব্যবহার করলে এ সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
লটকনের পাইকারি ব্যবসায়ী হিমেল বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও মৌসুমের শুরুতেই ৭ টি বাগান কিনেছেন। এতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এসব বাগানের লটকন বিক্রি করে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন।
নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, নরসিংদীর মাটি ও আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার ফলনও খুব ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, লটকন চাষকে আরও লাভজনক করতে এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ, ফলের গুণগত মান উন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যতে কৃষকদের আরও লাভবান করবে।