শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
২৪ এপ্রিল ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি শপথ নেওয়ার দিন
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিন বছর তিন মাসের মেয়াদে আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি এই তিনটি ভিন্ন সরকারের শপথ পড়িয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতি মনোনীত হওয়া থেকে পদত্যাগ পর্যন্ত নানা কারণে রাজনৈতিক আলোচনায় ছিলেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সময় নিয়োগ পাওয়া এই রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরে ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সময় পদে থাকবেন কি না, এ নিয়ে অনেকবার প্রশ্ন উঠেছে, নানা রকম আলোচনা হয়েছে।
বিএনপি সরকার গঠনের পাঁচ মাসের একটু বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত এলো।
বিএনপি ও মো. সাহাবুদ্দিন
মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি পদে থাকা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল থেকে বিএনপিকে সমর্থন দিতে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রসঙ্গ এনেছিল দলটি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বেশ কয়েকবার তাকে সরানোর প্রসঙ্গ এলেও মূলত বিএনপির অবস্থানের কারণেই সেটা হয়নি।
২০২৬ এর নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পরও মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি পদে থাকবেন কি না সে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে তার বহাল থাকাটাই দৃশ্যমান হয়।
এমনকি বিএনপি সরকারের সাথে রাষ্ট্রপতির অনেকটা সুসম্পর্ক তৈরি হওয়ার মতো পরিস্থিতিও দেখা যায়।
বিএনপি নির্বাচিত হওয়ার দশ দিনের মধ্যে একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, সপ্তাহখানেক ধরে ভালো আছি বেশ।
সে সাক্ষাৎকারে কঠিন সময়েও বিএনপি ও এর শীর্ষ নেতৃত্ব তার পাশে ছিলেন বলে জানান তিনি। এছাড়া বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে সম্প্রতি বিএনপি সরকারের সঙ্গে তার এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।
বিএনপির উচ্চ পর্যায় থেকেই তাকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের বিভিন্ন সূত্র থেকেও বলা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক
২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন।
সেবছর ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রথমবারের মতো মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে পরিচয় করিয়ে দেন।
সেসময় রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে উল্লেখ ছিল যে ছাত্রজীবনে তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এবং ১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক আইনে তিনি তিন বছর কারাগারে বন্দি ছিলেন।
সেবছর গঠন হওয়া বাকশালের (বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ) পাবনা জেলা অংশের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান তার মনোনয়ন দেন বলে তথ্য অধিদফতরের (পিআইডি) ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়।
জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে তিনি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হিসেবেও নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের ক্ষেত্রে দল এবং দলীয় আদর্শের প্রতি তার আনুগত্যের প্রশ্ন বড় বিবেচনার বিষয় ছিল বলে দলটির নেতাদের অনেকে বলেছিলেন।
তবে দলীয় আনুগত্যের বিপরীতে রাষ্ট্রপতি পদে কতটা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে প্রশ্ন ও সমালোচনাও তৈরি হয়েছিল।
আইনগত বিতর্ক
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার নাম ঘোষণার পর আইনগত দিক থেকেও বিতর্ক তৈরি হয়।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের একজন সাবেক কমিশনার ছিলেন। দুদকের কমিশনার হিসেবে ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
সেসময় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল যে একজন সাংবিধানিক পদে থেকে লাভজনক পদে যেতে পারেন কি না।
এর প্রেক্ষাপট ছিল দুদকেরই আইন। সেটি অনুযায়ী দুদকের কোনো কমিশনার অবসর নেওয়ার পর প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগের যোগ্য হবেন না।
তখন রাষ্ট্রপতি পদটাই লাভজনক কি না সে প্রশ্ন আর বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা দুটি রিট হাইকোর্টে খারিজ করে দেওয়া হয়।
এরআগে, ১৯৯৬ সালের একটি রিটে হাইকোর্ট থেকে রায় এসেছিল যে রাষ্ট্রপতি পদটি লাভজনক নয়। বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ পাওয়ার সময় ওই রিট করা হয়েছিল।
শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র প্রসঙ্গ
২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে রাষ্ট্রপতির পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বড় আলোচনার জন্ম দেয়।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দিন জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন যে "প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি"।
কিন্তু কয়েক মাস পর একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তার কাছে পদত্যাগপত্রের কোনো দালিলিক প্রমাণ বা অফিসিয়াল কপি নেই।
এই বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় যেহেতু সেসময় শেখ হাসিনার অডিও বক্তব্য ও দল সংশ্লিষ্টরাও দাবি করছিলেন যে তিনি পদত্যাগ করেননি। আবার যেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে গঠন হয়েছিল, সেক্ষেত্রে পুরো বিষয়টিই জটিল আকার ধারণ করে।
২০২৪ এর অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতির সে বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় মিছিল-সমাবেশ করে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগেরও দাবি তোলা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির পদচ্যুতির জন্য আল্টিমেটামও দেওয়া হয়।
সামাজিক মাধ্যমেও অন্তর্বর্তী সরকার সমর্থক ও আওয়ামী লীগ বিরোধীরা রাষ্ট্রপতির তীব্র সমালোচনা করেন এবং তাকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি তোলেন।
এরপর বঙ্গভবন থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, মীমাংসিত বিষয়ে নতুন করে কোন বিতর্ক সৃষ্টি না করার জন্য।
সেসময় রাষ্ট্রপতি ইস্যু নিয়ে অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছুটা দূরত্বও তৈরি হতে দেখা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে টানাপড়েন
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ প্রসঙ্গ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই আলোচনায় ছিল।
২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর তার মেয়াদের মাঝপথেই পদত্যাগের পরিকল্পনা করছেন।
সে প্রতিবেদনে বলা হয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কারণে তিনি 'অপমানিত' বোধ করছেন এবং তিনি বিদায় নিতে আগ্রহী।
সেসময় সাক্ষাৎকারের বেশ কিছু দিক নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে তার সম্পর্কের টানাপড়েনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
এর মধ্যে ছিল তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস প্রায় সাত মাস তার সঙ্গে দেখা না করা, রাষ্ট্রপতির প্রেস বিভাগ সরিয়ে নেওয়া এবং সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে তার প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলা।
বিদেশের কনস্যুলেট, দূতাবাস ও হাইকমিশন থেকে প্রেসিডেন্টের ছবি সরিয়ে দেওয়া নিয়ে ইউনূসকে তিনি লেখার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং তার 'কণ্ঠরোধ করা হয়েছে' এমন কথাও আসে।
সেখানে পদত্যাগ করার ব্যক্তিগত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি পরবর্তী সরকারকেই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দেবেন বলে উল্লেখ করা হয়।
শেষ পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়ে এসেই পদত্যাগ করলেন। সূত্র: বিবিসি বাংলা